বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য, বিশেষ করে নারী, শিশু ও তরুণদের তামাকের ভয়াবহ ছোবল থেকে বাঁচাতে ‘তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ২০২৫’ বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশনেই পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হতে যাচ্ছে। সোমবার (৩০ মার্চ) বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংসদীয় বিশেষ কমিটির সভাপতি ও সংসদ সদস্য এডভোকেট জয়নুল আবেদীন।
নারী মৈত্রী আয়োজিত ‘তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালী করার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক এই সভায় নীতিনির্ধারক, অধিকারকর্মী এবং তরুণ প্রতিনিধিরা সংহতি প্রকাশ করেন।
রাজস্বের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি
প্রধান অতিথির বক্তব্যে এডভোকেট জয়নুল আবেদীন এমপি বলেন, ‘আমরা মনে করি, তামাক থেকে আসা রাজস্বের চেয়ে মানুষের জীবনের মূল্য অনেক বেশি। সংসদীয় বাধ্যবাধকতা মেনেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই অধ্যাদেশটিকে আইনে রূপান্তর করা হবে। সংসদ সদস্যরা তামাকের ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে জোরালো আলোচনা করবেন এবং আমরা এটি পাসে সক্ষম হবো।’
অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যঝুঁকির ভয়াবহ চিত্র
মতবিনিময় সভায় নারী মৈত্রীর কোঅর্ডিনেটর নাসরিন আকতার উপস্থাপিত প্রবন্ধে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে:
মৃত্যুহারঃ টোব্যাকো এটলাস ২০২৫ অনুযায়ী, বাংলাদেশে তামাকজনিত রোগে বছরে প্রায় ২ লাখ মানুষ মারা যায়, যা দৈনিক গড়ে ৫৪৬ জন।
অর্থনৈতিক ক্ষতিঃ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তামাক খাত থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব এলেও, তামাকজনিত অসুস্থতা ও পরিবেশগত ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ব্যয় হয় প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা- যা আয়ের দ্বিগুণেরও বেশি।
নারীর ঝুঁকিঃ বাংলাদেশে তামাকজনিত রোগে মৃত্যুবরণকারী নারীদের হার ১১ শতাংশের বেশি।
প্রস্তাবিত আইনে যা থাকছে
২০২৫ সালের এই সংশোধিত অধ্যাদেশে তামাক কোম্পানিগুলোর বিপণন কৌশল রুখতে বেশ কিছু বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে:
১। পাবলিক প্লেসে নিষেধাজ্ঞাঃ পরোক্ষ ধূমপান থেকে অধূমপায়ীদের বাঁচাতে পাবলিক প্লেস ও গণপরিবহণে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
২। বিজ্ঞাপন ও প্রদর্শন বন্ধঃ বিক্রয়কেন্দ্রে তামাকজাত দ্রব্য প্রদর্শন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে যেকোনো ধরণের প্রচারণা নিষিদ্ধ।
৩। সুরক্ষা বলয়ঃ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাক বিক্রি নিষিদ্ধ।
৪। সচিত্র সতর্কবাণীঃ প্যাকেটের গায়ে সতর্কবার্তার আকার ৫০% থেকে বাড়িয়ে ৭৫% করা।
৫। নতুন নেশা প্রতিরোধঃ ই-সিগারেট, ভ্যাপ ও নিকোটিন পাউচের মতো উদীয়মান তামাকজাত পণ্যের বিস্তার রোধ।
তরুণ সমাজ ও নাগরিক সমাজের দাবি
নারী মৈত্রীর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আকতার ডলি বলেন, ‘তামাককে না বলি, জীবনকে হ্যাঁ বলি- এটিই হোক সবার স্লোগান।’ অন্যদিকে, তরুণ প্রতিনিধি তাসফিয়া নওরিন স্মরণ করিয়ে দেন যে, দেশের ২৮ শতাংশ তরুণই তামাক কোম্পানিগুলোর প্রধান লক্ষ্য। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে অকাল মৃত্যু থেকে বাঁচাতে আইনের কোনো বিকল্প নেই।
সিটিএফকে-বাংলাদেশ এর লিড পলিসি এডভাইজর মোঃ মোস্তাফিজুর রহমানসহ অন্যান্য বক্তারা সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী দ্রুত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। সভায় তামাকবিরোধী মায়েদের ফোরাম, শিক্ষক ফোরাম এবং নারী সাংবাদিক ফোরামের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে এই আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন।

