এসএমই খাতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যয় কমানোর প্রস্তাব

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতকে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির আওতায় আনার এক যুগান্তকারী রোডম্যাপ প্রকাশ করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ’। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিকল্পিত ডিকার্বনাইজেশন বা কার্বন নিঃসরণ কমানোর পদক্ষেপ নিলে এই খাতের পরিচালনা ব্যয় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব, যা একইসঙ্গে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ভূমিকা রাখবে।

শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ‘এসএমই শিল্পসমূহের উপর জ্বালানি ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ এবং ডিকার্বনাইজেশন সম্ভাবনা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়- বিসিক (BSCIC) শিল্পনগরীগুলোতে বিকেন্দ্রীভূত রুফটপ সোলার প্যানেল ব্যবহারের মাধ্যমে বছরে ১৪.০৯ মিলিয়ন টনের বেশি কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব। এর ফলে ‘কার্বন ক্রেডিট’ সুবিধা ব্যবহার করে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ০.৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রাজস্ব আয় করতে পারে। অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য যা রোল মডেল হতে পারে।

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ-এর প্রধান গবেষক এম জাকির হোসেন খান বলেন, ‘জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে হলে আমাদের আমদানি নির্ভরতা কমাতে হবে। চীন, ভারত এবং ভিয়েতনামের মতো মডেল গ্রহণ করে আমাদের এসএমই খাতকে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা এখন সময়ের দাবি।’

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান। যেমন- দেশের মোট শিল্প ইউনিটের ৯০ শতাংশের বেশি এসএমই খাতের অন্তর্ভুক্ত। এই খাত শিল্প খাতের প্রায় ৮৫ শতাংশ শ্রমশক্তি নিয়োগ করে এবং জিডিপিতে এই খাতের অবদান ২৫-৩০ শতাংশ। অথচ, এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এই খাতটি বর্তমানে ৯৫ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানি ভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল- যা বিশ্ববাজারের অস্থিরতার কারণে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।

গবেষণায় বিসিক শিল্পনগরীর চারটি উচ্চ-প্রভাবশালী খাতের ওপর বিশেষ আলোকপাত করে জানানো হয় যে- প্লাস্টিক উৎপাদনে ৩৩-৪৯% কার্বন নিঃসরণ, চামড়া শিল্পে ১৯-৩৩% নিঃসরণ, হালকা প্রকৌশলে ১৯-৩১% নিঃসরণ এবং প্যাকেজিং শিল্পে ১৫-২৮% নিঃসরণ কমানো সম্ভব।

গবেষকদের মতে, বিসিক শিল্পনগরীর মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ খালি জায়গা ব্যবহার করে ১১৪ মেগাওয়াট পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। আর্থিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, একটি ২০ কিলোওয়াট রুফটপ সোলার সিস্টেমের বিনিয়োগ মাত্র ৪.২ বছরেই তুলে আনা সম্ভব। এমনকি ‘ওপেক্স’ মডেলের মাধ্যমে কোনো প্রাথমিক বিনিয়োগ ছাড়াই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বিদ্যুৎ বিল কমিয়ে আনতে পারেন।

ভবিষ্যৎ পথনকশা ও সুপারিশ হিসেবে গবেষণাটি সফল করতে তিনটি মূল স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে একটি ‘ডিকার্বোনাইজেশন পাথওয়ে’ প্রস্তাব করা হয়েছেঃ
১. শিল্পনগরী পর্যায়ে অংশীদারিত্বমূলক নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা।
২. স্বল্প সুদে অর্থায়ন এবং উদ্ভাবনী আর্থিক মডেল (যেমনঃ গ্রিন ফাইন্যান্সিং)।
৩. বিসিক ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়।

এম জাকির হোসেন খান সরকারের কাছে কৃষকদের মতো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্যও ‘এসএমই কার্ড’ প্রদানের আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, ট্যাক্স বেনিফিট এবং ইনসেন্টিভ প্রদানের মাধ্যমে এই রূপান্তর ত্বরান্বিত করলে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী, স্বনির্ভর এবং পরিবেশবান্ধব অর্থনীতি হিসেবে বিশ্ববাজারে নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করতে পারবে।