রীতা ভৌমিক ও মারুফ উল আলম (ঢাকা ব্যুরো)
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে ভাষাগত জগতের এক দ্বিমুখী বাস্তবতার ছবি ফুটে উঠেছে। একদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় বইমেলায় বাংলা ভাষার বিশ্বজয়ের বার্তা দিচ্ছিলেন, অন্যদিকে রাজধানীর অন্য প্রান্তে আদিবাসী নেতা ও মানবাধিকার কর্মীরা সমবেত হয়ে কয়েক ডজন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষা বিলুপ্তির এক ‘নীরব সংকটের’ ব্যাপারে সতর্কবাণী দিয়েছেন।
বিশ্বের দীর্ঘতম মাসব্যাপী বইমেলা- ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’-এর উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি ‘জ্ঞানভিত্তিক, উদার ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ গড়ার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী বাংলাকে জাতিসংঘের অন্যতম দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কৌশলগত প্রচেষ্টার কথা পুনর্ব্যক্ত করে একে ‘আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিবর্তনের আলোকবর্তিকা’ হিসেবে অভিহিত করেন।
‘আমাদের ভাষা আমাদের অহংকার,’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী একটি ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’র ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তবে সমালোচকদের মতে, এই বহুমাত্রিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের অভাব রয়েছে- আর তা হলো এদেশের ৪০টিরও বেশি অবঙালী আদিবাসী ভাষার টিকে থাকার প্রশ্ন।
বৃহস্পতিবার ঢাকায় অধিকারভিত্তিক সংস্থা এএলআরডি (ALRD) আয়োজিত ‘প্রান্তিক ভাষা, প্রান্তের ভাষা, প্রান্তজনের ভাষা : তর্ক ও তপৎরতা’ শীর্ষক এক সেমিনারে গবেষকরা দেশের ভাষাগত বৈচিত্র্যের এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেন। সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন উন্নয়ন গবেষক ও লেখক পাভেল পার্থ । আলোচনায় অংশ নেন- বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মাহমুমুল সুমন ও মানবাধিকার কমিশনের সদস্য ইলিরা দেওয়ান। স্বাগত বক্তব্য দেন এএলআরডি এর নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন- যা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিল, তার ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও বক্তারা অভিযোগ করেন যে- রাষ্ট্র তার নিজস্ব সংখ্যালঘু ভাষাগুলো রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে।

অধিকারভিত্তিক সংস্থা এএলআরডি আয়োজিত ‘প্রান্তিক ভাষা, প্রান্তের ভাষা, প্রান্তজনের ভাষা : তর্ক ও তপৎরতা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা। ছবি ঃ এএলআরডি’র সৌজন্যে।
এএলআরডি-র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, ‘আমরা মানসিকভাবে দরিদ্র হয়ে পড়ছি। আমাদের মাতৃভাষার (বাংলা) সংগ্রাম পৃথিবীর সকল মাতৃভাষার অধিকারকে সামনে নিয়ে আসার কথা ছিল, অথচ রাষ্ট্রীয় অবহেলার কারণে আদিবাসীরা তাদের ভাষা হারিয়ে ফেলছে।’
কন্দ, খাড়িয়া, কোডা, সৌরা এবং মুন্ডারি ভাষাগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, মৌলভীবাজারের খাড়িয়া ভাষায় কথা বলতে পারেন এমন মাত্র দুইজন প্রবীণ বোন বর্তমানে বেঁচে আছেন।
গবেষক পাভেল পার্থ উল্লেখ করেন যে, ভৌগোলিক নামগুলোর ‘বাংলাকরণ’- যেমন প্রাচীন ‘গারোবাজার’- এর নাম বদলে ‘মুরাইদ-সিরাজনগর’ রাখা- এই জাতিগোষ্ঠীগুলোর ঐতিহাসিক পরিচয় মুছে দিচ্ছে।
সরকারি নীতি থাকা সত্ত্বেও আদিবাসী শিশুরা এখনও তাদের নিজস্ব লিপিতে (যেমন অলচিকি বা চাকমা) প্রাথমিক শিক্ষা পাচ্ছে না, যা টিকে থাকার প্রয়োজনে তাদের বাংলাকে গ্রহণ করতে বাধ্য করছে।
সেমিনারে রাজনৈতিক দলগুলোর এক হতাশাজনক উদাসীনতার চিত্র তুলে ধরে বক্তারা বলেন- সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে কোনো বড় রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে আদিবাসী ভাষা সংরক্ষণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেনি। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং জানান, জাতিসংঘ ২০২২-২০৩২ সময়কালকে ‘আদিবাসী ভাষার দশক’ ঘোষণা করলেও বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এটি উদযাপনে বড় কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
মানবাধিকার কমিশনের সদস্য ইলিরা দেওয়ান এবং অধ্যাপক মাহমুদুল সুমন জোর দিয়ে বলেন যে, একাডেমিক গবেষণা এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ভাষাগত ইনস্টিটিউট ছাড়া এই ভাষাগুলো জীবন্ত সত্তার বদলে কেবল ‘জাদুঘরের প্রদর্শনী’ হয়ে থাকবে।
অমর একুশে বইমেলা উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন বাংলা একাডেমিতে ‘উদার গণতন্ত্রের’ কথা বলছেন, বাংলাকে জাতিসংঘের অন্যতম দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কৌশলগত প্রচেষ্টার কথা বলছেন, তখন বৈপরীত্যটি বেশ প্রকটভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের সাফল্য এখন নির্ভর করছে সরকার একক ভাষার আধিপত্য ছাড়িয়ে দেশের প্রকৃত ঐতিহ্য বহনকারী ৪১টি মাতৃভাষাকে কতটা সুরক্ষা দিতে পারে তার ওপর।

রীতা ভৌমিক ও মারুফ উল আলমঃ ষ্টাফ করেসপন্ডেন্ট, প্রেসেঞ্জা- ঢাকা ব্যুরো।

