গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নতুন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শপথ নেন তিনি। শপথ পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তিনি। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার দল বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়।
তারেক রহমান মঙ্গলবার সকালে জাতীয় সংসদের প্রথম সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। এরপর সংসদীয় সভায় তারেক রহমানকে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করেন বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্যরা। সরকারি দলের প্রথম সভায় সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হন তিনি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর শপথের পর প্রথমে নতুন সরকারের মন্ত্রী এবং পরে প্রতিমন্ত্রীরা শপথ গ্রহণ করেন। নবগঠিত মন্ত্রী সভায় নতুন চমক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান। তিনি টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী হয়েছেন।
এর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হলো। একই সঙ্গে প্রায় দুই যুগ পর বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের যাত্রা শুরু হলো। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ১৮ মাস পর নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হলো এই সরকার। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২০৯ আসনে জয়ী হয়। বিএনপি জোটের শরিকেরা ৩টি আসন পায়।

মঙ্গলবার সকালে জাতীয় সংসদে বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সাথে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন তারেক রহমান। ছবিঃ বিএনপি মিডিয়া সেল এর সৌজন্যে।
শপথ অনুষ্ঠানে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতিনিধি এবং দেশী-বিদেশী আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন ভারত, পাকিস্তান, নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নেতারাও। আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা নয়াদিল্লির প্রতিনিধিত্ব করেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসের দীর্ঘ ঐতিহ্য ভেঙে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনের পরিবর্তে জাতীয় সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয়।
এর আগে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারে ছিল। ২০ বছর পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করলো দলটি। বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় ৫০ জনের মধ্যে মন্ত্রী ২৫ জন ও প্রতিমন্ত্রী ২৪ জন। তাদের মধ্যে টেকনোক্রাট রয়েছেন তিনজন। ২৫ জন মন্ত্রীর মধ্যে নতুন মুখ ১৬ জন আর ২৪ জন প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে সবাই নতুন। সব মিলিয়ে ৫০ জনের মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ ৪১ জন। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানও নতুন। এবারই তিনি একাধারে প্রথম সংসদ সদস্য, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন।
প্রসঙ্গত, নির্বাচনের মাত্র একমাস আগে মায়ের মৃত্যুর পর দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন মিঃ তারেক রহমান। তবে দীর্ঘ পথ পথপরিক্রমায় তার চলার পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিলে না। বন্ধুর পথ অতিক্রম করেই তাকে এতটুকু আসতে হয়েছে। মামলার বোঝা নিয়ে দেশান্তরী হওয়া, রিমান্ড, কারাগার ও নির্বাসনে থেকে দেশ পরিচালনা- সব মিলিয়ে এক কঠিন পথ পাড়ি দিয়েই রাষ্ট্র ক্ষমতার শীর্ষে আরোহন করলেন।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে শপথ গ্রহণ করেছেন নতুন সরকারের মন্ত্রীগণ। ছবিঃ বিএনপি মিডিয়া সেল এর সৌজন্যে।
বাংলাদেশে ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে আটক হয়েছিলেন তারেক রহমান। এরপর ১৮ মাস কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পেয়ে সপরিবারে লন্ডনে চলে গিয়েছিলেন তিনি। প্রায় ১৭ বছর পর তিনি ঢাকায় ফিরে এসেছেন গত ২৫ ডিসেম্বর।
বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রথম সামরিক শাসক ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং প্রথম ও তিনবারের মহিলা প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় সন্তান। তিনি ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে আশির দশকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন। যদিও পরে তিনি ড্রপ-আউট হন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আরও অনেক সামরিক কর্মকর্তা পরিবারের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের পরিবারকেও বন্দি করা হয়েছিল। তখন তাদের দুই ছেলে তারেক রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমানও বন্দি ছিলেন। আশির দশকে সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনে তিনি যোগ দিয়েছিলেন এবং ১৯৮৮ সালে বগুড়া জেলা বিএনপির গাবতলী উপজেলা ইউনিটের সদস্য হিসেবে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে সক্রিয় হন। যদিও তারেক রহমানের দলীয় রাজনীতির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে এবং সেই সময় খালেদা জিয়া যে পাঁচটি আসনে নির্বাচন করেছিলেন তিনি সেগুলোর দেখভালের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

