বাংলাদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভূমিহীন, নারী ও আদিবাসীসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার নিশ্চিত করার দাবি তুলেছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিক সমাজ ও অধিকারকর্মীরা। বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম এ্যান্ড ডেভলপমেন্ট (এএলআরডি) আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে এই দাবি জানানো হয়েছে।
সেমিনারে বক্তারা রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের নির্বাচনী ইশতেহারে আইএলও (ILO) কনভেনশন ১৪১ ধারা সংশোধন ও বাস্তবায়নের অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান। এছাড়া যৌথ চাষাবাদের জন্য সমবায় সমিতি নিবন্ধন সহজ করা, কৃষিতে নারীর আইনি স্বীকৃতি এবং আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমির অধিকার রক্ষার বিষয়টিও আলোচনায় প্রাধান্য পায়।
কৃষিতে নারীর অবদান বনাম বঞ্চনা
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে এএলআরডি’র উপ-নির্বাহী পরিচালক রওশন জাহান মনি বলেন, ‘বিবিএস শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, কৃষি শ্রমশক্তির প্রায় ৫৮ শতাংশ নারী হওয়া সত্ত্বেও জমির মালিকানায় তাদের অবস্থান মাত্র ২ শতাংশ। অথচ গত তিন দশকে কৃষিখাতে দেওয়া ভর্তুকির বড় অংশই প্রকৃত কৃষকরা পাননি। ’
এএলআরডি’র চেয়ারপার্সন এবং ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবির এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে বক্তারা বলেন, এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় প্রান্তিক মানুষের মৌলিক অধিকারের বিষয়টি সেভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে না।
জিডিপি বনাম তৃণমূলের বাস্তবতা
বাসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন অর্থনীতির এক বৈচিত্র্যময় চিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘জিডিপিতে কৃষির অবদান কমছে বলে অনেক নেতা হতাশা প্রকাশ করেন, কিন্তু এটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের প্রকৃত চিত্র নয়। ১১৩ জন ঋণখেলাপি প্রার্থী এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন, যাদের অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। অথচ মাত্র ১০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে সমবায়ের মাধ্যমে ৪৮ লক্ষ নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। ’ তিনি অভিযোগ করেন, ভূমি, ভাত ও ভোটের অধিকারের সাথে এখন ‘ভয়’ ও ‘জালিয়াতি’ যুক্ত হয়েছে।
তৃণমূলের আর্তনাদ
সেমিনারে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা নারী নেত্রীরা তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন:
রাহেলা আক্তার (মুক্তাগাছা): ‘আমরা ভূমিহীন নারীরা যৌথ চাষাবাদ করলেও সমবায় অধিদপ্তরের কোনো সহায়তা পাই না। সমবায় নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি। ’
সাবিনা হেমব্রম (দিনাজপুর): ‘আদিবাসী নারীরা সরাসরি কৃষির সাথে জড়িত থাকলেও তারা কৃষি কার্ড পায় না। আদিবাসীদের খাস জমি বন্দোবস্তের নিশ্চয়তা চাই। ’
মিতা রাণী (বাউফল): ‘নারী কৃষকরা ন্যায্য মজুরি পান না। আমাদের দাবি, যারা সংসদ সদস্য হবেন, তারা যেন নারী কৃষকদের আইনি স্বীকৃতি নিশ্চিত করেন। ’
কাঠামোগত সংস্কারের দাবি
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল ভূঁইয়া বলেন, ‘ক্ষমতা কাঠামো জনগণের পক্ষে না আনা পর্যন্ত প্রান্তিক মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত হবে না। ’ অন্যদিকে, বিশিষ্ট সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, ‘আমরা একটি বৈষম্যপূর্ণ সমাজে বাস করছি, যেখানে নারীরা ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে বঞ্চিত। ’
রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস, বাংলাদেশ (রিব)-এর পরিচালক সুরাইয়া বেগম এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরে বলেন, রাসায়নিক কৃষি জলবায়ু পরিবর্তনে ৩৩ শতাংশ ভূমিকা রাখে। নারীদের হাতে ভূমির অধিকার থাকলে তারা জৈব সারের মাধ্যমে ‘নিরাপদ কৃষি’ নিশ্চিত করতে পারবেন, যা জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হবে।
প্রধান দাবিগুলো একনজরে:
১. আইএলও কনভেনশন ১৪১-এর সংশোধন ও পূর্ণ বাস্তবায়ন। ২. জাতীয় ভূমি কমিশন গঠন এবং ভূমি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা। ৩. সমবায় আইন পরিবর্তন করে প্রান্তিক কৃষকদের নিবন্ধন সহজ করা। ৪. নারী ও আদিবাসী কৃষকদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও কৃষি কার্ড প্রদান। ৫. বনজ সম্পদে আদিবাসী নারীদের প্রথাগত অধিকার নিশ্চিত করা।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, স্পিড ট্রাস্টের শামসুল ইসলাম দীপু এবং রুলফাও-এর আফজাল হোসেন। তারা প্রত্যেকেই একমত পোষণ করেন যে, ভূমি অধিকারের এই লড়াই শুধু সংসদের ভেতর নয়, রাজপথেও চালিয়ে যেতে হবে।

