বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বাকযুদ্ধ ও যুক্তিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সংবিধানের গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে এই আলোচনার সূত্রপাত হয়।
মঙ্গলবার অধিবেশনের শুরুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের অঙ্গীকার পূরণে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সকল রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র সদস্যদের সমন্বয়ে একটি ‘সংবিধান সংশোধন বিশেষ সংসদীয় কমিটি’ গঠনের আহ্বান জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সমঝোতার ভিত্তিতে একটি জনপ্রত্যাশিত সংবিধান সংশোধনী বিল এই মহান সংসদে উত্থাপন করতে চাই।’ তবে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারিকৃত ‘জুলাই আদেশ’-এর আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে একে ‘ভয়েড অ্যাব ইনিশিও’ (সূচনা থেকেই অবৈধ) হিসেবে অভিহিত করেন।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাবকে স্বাগত জানালেও একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত জুড়ে দেন। তিনি দাবি করেন, এই কমিটিতে সরকারি ও বিরোধী দল-উভয় পক্ষ থেকে সমান সংখ্যক (৫০-৫০) সদস্য থাকতে হবে।
তার মতে, কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে কমিটি গঠন করলে তা ‘যে লাউ সেই কদু’র মতো অর্থহীন হয়ে পড়বে। তিনি বলেন, ‘আইন বা সংবিধান মানুষের জন্য; মানুষ আইন বা সংবিধানের জন্য নয়। আমরা দলের নয়, জনগণের অভিপ্রায়কে সম্মান জানাতে এখানে এসেছি।’
তবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এই দাবির বিরোধিতা করে একে ‘বৈষম্যমূলক’ বলে আখ্যা দেন। তিনি যুক্তি দেখান যে, ২১৯ জন এমপির প্রতিনিধি এবং ৭৭ জন এমপির প্রতিনিধি সমান হতে পারে না।
জুলাই বিপ্লব ও জেন-জি প্রসঙ্গ
বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ তরুণ প্রজন্ম বা ‘জেন-জি’ (Gen-Z)-কে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ে সীমাবদ্ধ না হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি সংবিধান ছুড়ে ফেলার পরিবর্তে সংস্কারের ওপর জোর দেন এবং জুলাই অভ্যুত্থানে সকল রাজনৈতিক দলের ত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আপনারা ৬ বলে ১২ রান করেছেন, কিন্তু আগের ৩০০ রান আমরা সবাই মিলে করেছি।’
অন্যদিকে, বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ অভিযোগ করেন যে, সরকার মূল সংস্কারের কাজ ফেলে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বা ‘রাস্তা সংস্কারের’ মতো প্রান্তিক কাজে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। তিনি বলেন, ছাত্ররা রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য রক্ত দিয়েছে, কেবল সুযোগ-সুবিধার জন্য নয়।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনটি ছিল যুক্তিতর্ক ও সংসদীয় গণতন্ত্রের এক প্রাণবন্ত মহড়া। সংবিধান সংস্কারের এই প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত জাতীয় সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

