বাংলাদেশে ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অংশগ্রহণ
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজে নারীর অবস্থান নিয়ে এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর হার মাত্র ৩.৯৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এই প্রেক্ষাপটে নীতিনির্ধারক ও নাগরিক সমাজ এক সুরে দাবি তুলেছেন- নারীর জন্য কেবল ‘সুযোগ’ নয়, প্রয়োজন সহিংসতামুক্ত পরিবেশ এবং রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) একশনএইড বাংলাদেশ ও দৈনিক প্রথম আলোর আয়োজনে রাজধানী গুলশানের একটি হোটেলে ‘নারী নেতৃত্ব ও সুরক্ষা’ বিষয়ক বিশেষ সংলাপে বক্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
এছাড়া নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিতে কেবল সুযোগ নয়, বরং নারীর নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং রাজনৈতিক মাঠে একটি ‘ লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরিতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর জোরালো দাবি জানানো হয় দেশের নীতিনির্ধারক ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি। এবারের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য ‘গিভ টু গেইন’ (পারস্পরিক সংহতি ও নেতৃত্বে বিনিয়োগ) এবং জাতীয় প্রতিপাদ্য ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচারঃ সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’ এর আলোকে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) রাজধানী ঢাকার একটি হোটেলে একশনএইড বাংলাদেশ ও দৈনিক প্রথম আলো আয়োজিত ‘নারী নেতৃত্ব ও সুরক্ষা’ শীর্ষক বিশেষ সংলাপে বক্তারা বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরেন। সংলাপে উপস্থাপিত তথ্য বিশ্লেষনে মোটা দাগে দেখা যায়ঃ
নির্বাচনী বিপর্যয়: এবারের নির্বাচনে মাত্র ৭ জন নারী জয়লাভ করেছেন, যা ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় নির্বাচনের সমান।
সহিংসতার উর্ধ্বগতি: ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে ৫২.৩ শতাংশ। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসেই ২৭২ জন নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা: দেশের ৩৯ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয়নি।
সংলাপে সাবেক সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক নেত্রীরা সরাসরি কাঠামোগত সংস্কারের দাবি জানান। সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন ‘আমরা শক্তিশালী নারীকে কন্যা বা বোন হিসেবে দেখতে চাই, কিন্তু সহযোদ্ধা হিসেবে নয়- এই পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাধারা বদলাতে হবে।’
চিকিৎসক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ডা. তাসনিম জারা অনলাইন হেনস্তাকে তরুণীদের রাজনীতিতে আসার প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, ‘সাইবার বুলিং’ রুখতে এবং একটি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করতে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের কার্যকর ভূমিকা অপরিহার্য।”
নায়াব ইউসুফ আহমেদ এমপি বলেন, ‘প্রান্তিক নারীরা যে মৌলিক ও ন্যায্য অধিকার পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত- সেটা বোঝার অবস্থা তাদের নেই। তাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদের ঘরকুনো করে রাখার চেষ্টা করা হয়। নারীদের সমস্যা নিরসনে আমাদেরই দাঁড়াতে হবে।’
অন্যদিকে, একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির নারী প্রার্থীদের ‘সবচেয়ে সাহসী মানুষ’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, জয়ের সংখ্যার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা।
সেমিনারে বক্তব্য দেন- গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমান, ব্রিটিশ হাই কমিশনের সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাডভাইজার তাহেরা জাবীন, ইউএনডিপি’র সিনিয়র জেন্ডার অ্যানালিস্ট শারমিন ইসলাম, একশনএইড ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সোসাইটির চেয়ারপার্সন ইব্রাহিম খলিল আল জায়াদ, জাগো ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা করভি রাখসান্দ এবং জাতীয় রাজনৈতিক অধিকার ফোরামের সাদাফ। সংলাপে অংশগ্রহণকারী বিশিষ্টজনেরা কয়েকটি মূল পদক্ষেপের ওপর জোর দেনঃ
রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ: নারীর নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো।
আইনি প্রয়োগ: জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা ও সাইবার বুলিং রোধে কঠোর আইন ও তার দ্রুত বাস্তবায়ন।
দলীয় সংস্কার: রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে কেবল ‘প্রতীকী’ হিসেবে নয়, বরং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
শ্রম অধিকার: কৃষি ও গার্মেন্টস খাতে নারী শ্রমিকদের সমান মজুরি ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
সংলাপের বিশেষ আকর্ষণ ছিল নাট্য সংগঠন ‘পালাকার’-এর পরিবেশনায় ইন্টারেক্টিভ ফোরাম থিয়েটার ‘চেনা পরবাস’। এটা ছিলো অনেকটা- শিল্পের ভাষায় প্রতিবাদ। অভিনয়ের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি এবং নির্বাচনী মাঠে নারী প্রার্থীদের লড়াইয়ের বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়। অনুষ্ঠানে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া ২০ জন সাহসী নারী প্রার্থীকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়।
সেমিনারে অংশ নেয়া বক্তাদের সুরে উঠে এসেছে- ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য ‘গিভ টু গেইন’ (নেতৃত্বে বিনিয়োগ) এবং জাতীয় প্রতিপাদ্য ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার’-এর প্রতিফলন ঘটাতে হলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্রকে এখনই সক্রিয় হতে হবে। তারা মনে করেন- নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ হ্রাস পাওয়া কেবল নারীর সমস্যা নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্যের অবনতির লক্ষণ।
রীতা ভৌমিকঃ সিনিয়র সাংবাদিক ও করেসপন্ডেন্ট প্রেসেঞ্জা- ঢাকা ব্যুরো।

