বাংলাদেশে তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি নারী তাদের জীবনে কোনো না কোনো সময় সহিংসতার শিকার হন। এই ভয়াবহ পরিসংখ্যানের প্রেক্ষাপটে, কেবল আদালতের চার দেয়ালের মধ্যে নয়, বরং সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন এবং জবাবদিহিতার মাধ্যমে নারীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
জাতিসংঘের নারীর মর্যাদা বিষয়ক কমিশনের (CSW70) ৭০তম অধিবেশন উপলক্ষ্যে বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যায় আয়োজিত এক অনলাইন প্যারালাল ইভেন্টে বক্তারা এই গুরুত্বারোপ করেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের মূল প্রতিপাদ্য ছিল- ‘জাস্টিস বিয়ন্ড দ্য কোর্টরুম: স্ট্রাকচারাল ব্যারিয়ার্স ফেসিং উইমেন অ্যান্ড গার্লস ইন বাংলাদেশ’।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ফউজুল আজিম। তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের সংবিধান ও আইন নারীর অধিকারের নিশ্চয়তা দিলেও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা এবং আইনি সচেতনতার অভাব নারীদের জন্য ন্যায়বিচারের পথে বড় বাধা। তিনি বলেন, ‘ন্যায়বিচার কেবল আইনি প্রক্রিয়া নয়, এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সাথে গভীরভাবে যুক্ত।’
প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড উপ-কমিটি ৯৯০টি অভিযোগ গ্রহণ করেছে। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) পদ্ধতির মাধ্যমে ৪৭৩টি মামলা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার ৫০ শতাংশই শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এর মাধ্যমে ভুক্তভোগী নারীদের জন্য প্রায় ৬৩ লাখ ৪ হাজার ৬০০ টাকা দেনমোহর আদায় করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া সংগঠনটির আশ্রয়কেন্দ্র ‘রোকেয়া সদন’ সহিংসতার শিকার নারীদের পুনর্বাসন ও মনোসামাজিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. আব্দুর রাজ্জাক খান জেন্ডার-সংবেদনশীল সাংবাদিকতার ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘গণমাধ্যম কেবল তথ্যদাতা নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার। এটি ভুক্তভোগীদের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করতে পারে এবং প্রচলিত বৈষম্যমূলক ধারণাগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।’
সাবেক সচিব রেহানা পারভীন এবং মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু তাদের বক্তব্যে শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং বৈশ্বিক সংহতির গুরুত্ব তুলে ধরেন। মালেকা বানু বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের প্রেক্ষাপটে অবিলম্বে ও নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতির আহ্বানও জানান।
অধিবেশনের মডারেটর এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম তার সমাপনী বক্তব্যে বলেন, ‘ধর্ষণ একটি ফৌজদারি অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও সমাজে এখনো সালিশের মাধ্যমে আপোষের চেষ্টা করা হয়। আমাদের লক্ষ্য একটি জেন্ডার-বান্ধব ন্যায়বিচার ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে সমাজ ও পরিবার সমানভাবে সচেতন থাকবে।’
আন্তর্জাতিক উইমেন পিস গ্রুপ এবং নরডিক কনসালটিং গ্রুপের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে এই অধিবেশনটি বাংলাদেশে নারীর মানবাধিকার রক্ষায় একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।

