নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর বাংলাদেশের ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করতে যাচ্ছেন তারেক রহমান। তবে অনেক ঐতিহাসিক নেতার মতো তার সামনেও এখন এক অদ্ভুত বৈপরীত্য: একটি নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট অনেক সময় চরম পতনের বীজও বহন করে আনে।

দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন, আইনি লড়াই এবং তার দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ওপর চলা কঠোর দমন-পীড়ন শেষে মিঃ রহমানের এই প্রত্যাবর্তনকে সমর্থকরা জাতির ‘আত্মার পুনরুদ্ধার’ হিসেবে দেখছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অভিজ্ঞ সাংবাদিকরা সতর্ক করে বলছেন, কর্তৃত্ববাদের শিকার হওয়া একজন নেতার ‘গণতন্ত্রের পাহারাদার’ হিসেবে রূপান্তরিত হওয়ার এই পথটি পদ্ধতিগত নানা ফাঁদে পূর্ণ।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমানের বংশীয় ঐতিহ্য অনন্য। তার পিতা জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন যুদ্ধজয়ী বীর এবং দেশের রাষ্ট্রপতি- যিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন করেছিলেন। তার মা বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন দেশের প্রথম এবং তিনবারের মহিলা প্রধানমন্ত্রী। তবে এই উত্তরাধিকার তার জন্য যেমন ঢাল, তেমনি এক বিশাল দায়ভারও।

জানতে চাইলে দেশের প্রথিতযশা রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী সংবাদ সংস্থা প্রেসেঞ্জা বলেন- ‘নিরঙ্কুশ বিজয় যেমন উপভোগ্য, তেমনি এটি একইসঙ্গে আশঙ্কারও। ইতিহাস বলে, বড় জয় অনেক সময় নেতৃত্বের মধ্যে আত্মতৃপ্তি ও চাটুকারিতার জন্ম দেয়, যা শেষ পর্যন্ত তাকে সুশাসনের পথ থেকে বিচ্যুত করে পতনের অতল গহ্বরে টেনে নেয়। ’

অতীতের যেকোনো রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের তুলনায় ২০২৬ সালের এই সরকার এক ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি। বর্তমানে তারা ‘জেনারেশন জে’ বা নতুন প্রজন্মের তীক্ষ্ণ নজরদারিতে রয়েছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার বিপ্লব- যা শেখ হাসিনার ১৫ বছরের লৌহ শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল, তারা দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক চুক্তিতে আমূল পরিবর্তন এনেছে।

মিঃ চৌধুরী বলেন, ‘এই প্রজন্ম ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে কথা বলতে শিখেছে। তারা কেবল কিতাবের ভাষায় নিজেকে ‘প্রজাতন্ত্রের মালিক’ হিসেবে পড়তে চায় না, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখতে চায়।”

সাবেক আওয়ামী শাসনের পতন এখন ‘তথ্য-বিভ্রাটের’ এক চরম সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, হাসিনার চারপাশের একটি সুবিধাবাদী গোষ্ঠী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং দলীয় সিন্ডিকেট বাস্তব তথ্যকে তিন স্তরে ফিল্টার করে তার কাছে পৌঁছে দিত, যা শেষ পর্যন্ত তার পতনকে ত্বরান্বিত করেছে।

তারেক রহমানের জন্য বর্তমান বাস্তবতায় বড় পরীক্ষা হলো তিনি নিচের সংস্কৃতিগুলো ভাঙতে পারবেন কি না-

১। টেন্ডার-নির্ভর রাজনীতি: চাঁদাবাজি ও লুটপাটের চক্র ভেঙে ফেলা।
২। প্রাতিষ্ঠানিক স্বজনপ্রীতি: নিজের পরিবারের সদস্য বা ঘনিষ্ঠ কেউ অভিযুক্ত হলেও আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া।
৩। গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ: ‘দলকানা’ সাংবাদিকতার চর্চা থেকে বেরিয়ে আসা, যা শেষ পর্যন্ত শাসকের চোখ অন্ধ করে দেয়।

নতুন প্রশাসনের জন্য রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ- গণমাধ্যম হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যারোমিটার। নিজে একজন প্রকাশক ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হওয়ায় তারেক রহমানের কাছে গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা যে- তিনি গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের কুফল বুঝতে পারবেন।

বিশ্লেষণ বলছেন, ‘গণমাধ্যম যখন দলীয় কর্মীতে পরিণত হয়, তখন শাসকের পতন কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। যদি তারেক রহমান দীর্ঘমেয়াদী জনআস্থা চান, তবে তাকে সংবাদমাধ্যমকে ‘শত্রু’ নয়, বরং ‘আয়না’ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ’

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জনআস্থার তিনটি প্রধান স্তম্ভ- স্বরাষ্ট্র, আইন এবং স্বাস্থ্য খাতের ওপর নতুন সরকারকে অবিলম্বে নজর দিতে হবে। স্বচ্ছ পুলিশিং এবং একটি কার্যকর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা হলো সেই ‘নীরব বিস্ফোরক’ যা একটি সরকারের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে পারে অথবা তার ভিত ধসিয়ে দিতে পারে।

ঢাকার আকাশে যখন এক নতুন রাজনৈতিক সূর্য উদিত হতে যাচ্ছে, বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব এখন সাগ্রহে তাকিয়ে আছে- তারেক রহমান কি ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের পুরোনো পথ বেছে নেবেন, নাকি প্রাতিষ্ঠানিক বিনয় ও সুশাসনের এক কঠিন কিন্তু সম্মানজনক পথ তৈরি করবেন?