কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া একটি উৎসবমুখর পরিবেশে বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহন শেষ হয়েছে।  ফলাফল গননা চলছে।  শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের পতনের পর আজই প্রথম একটি গণতান্ত্রিক অনুশীলনে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ।  প্রায় ১৩ কোটি ভোটার একটি যুগান্তকারী সাধারণ নির্বাচন এবং একই সঙ্গে একটি জাতীয় গণভোটে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন।  দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার অবসান ঘটিয়ে একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় বৃহস্পতিবার সারা দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে ভোট দিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেছেন।  অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকে একটি আনুষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক কাঠামোতে উত্তরণের এই সময়ে শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত ছিল ৯ লাখেরও বেশি নিরাপত্তা কর্মী।

সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সারাদেশে শুরু হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ।  ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার নির্ধারিত সময় ছিল বিকাল সাড়ে ৪টা।  ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর কেন্দ্রগুলোতে গণনা শুরু হয়েছে।  কেন্দ্রভিত্তিক ফল ঘোষণার পর আসনভিত্তিক একীভূত ফল প্রকাশ করবেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা।  পরে তা নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে স্থাপিত ফল সংগ্রহ ও পরিবেশন কেন্দ্র থেকে ঘোষণা করা হবে।

ভোট কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা ভোটারদের দীর্ঘ লাইন।
ছবি- জাগো নিউজের সৌজন্যে।

ভোট গ্রহন শেষ হওয়ার পর সারা দেশ থেকে প্রাপ্ত সংবাদে জানা গেছে- কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া একটি উৎসবমুখর পরিবেশে বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহন শেষ হয়েছে।  জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪২ হাজার ৬৫১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৩৬ হাজার ৩১ কেন্দ্রে দুপুর ২টা পর্যন্ত ৪৭ দশমিক ৯১ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।  এখন পর্যন্ত নির্বাচন পরিস্থিতিতে কোনো সমস্যা নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি।

গুলশানের কালাচাঁদপুর স্কুলে মোট সাতটি কেন্দ্র।  এর মধ্যে পাঁচটি কেন্দ্র ঘুরে বিকেল ৩টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৫৫ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বরত প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা।  ৩৭ নম্বর কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৪০ শতাংশ।  মোট ভোট দুই হাজার ৮৫৮।  কেন্দ্রটির প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মো. ফারুকুল ইসলাম প্রেস এজেন্সি- প্রেসেঞ্জা’কে বলেন, ‘আমি অনেক ভোট কাভার করেছি।  এবারের ভোটের মতো শান্তি পাইনি।  কোনো পেশিশক্তির ভয় নেই।  এত ঠাণ্ডা মাথায় আগে ভোটের দায়িত্ব পালন করতে পারিনি।

ভোট প্রদান শেষে ভোট গণনাকালে প্রতিটি কেন্দ্রে সেনা সদস্যদের কঠোর নিরাপত্তা নজরদারি লক্ষ্য করা গেছে। ছবি- বাংলা ট্রিবিউনের সৌজন্যে।

এবারের নির্বাচনে অংশ নিয়েছে ৫১টি রাজনৈতিক দল।  মোট প্রার্থী রয়েছেন ২ হাজার ৩৪ জন, যার মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৫ জন।  রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি, যারা ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছেন ২৯১ জন।  ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৫৮ জন প্রার্থী হাতপাখা প্রতীকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ২২৯ জন প্রার্থী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে এবং জাতীয় পার্টি ১৯৮ জন প্রার্থী লাঙ্গল প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।  জাতীয় নাগরিক পার্টির ৩২ জন প্রার্থী শাপলা কলি প্রতীকে রয়েছেন।  নির্বাচনে শেরপুর-৩ আসন বাদে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ভোট হয়েছে।  বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের প্রার্থীর মৃত্যুতে ওই আসনের নির্বাচন আগেই বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন।

অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, অধ্যাপক ড মুহাম্মদ ইউনূস সকালে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল, ঢাকার একটি ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হন।  তিনি ভোটারদের সাথে কুশল বিনিময়ের সময় তাঁকে বেশ শান্ত ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ দেখাচ্ছিল।  ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত সাংবাদিকদের তিনি বলেন- ‌‌’আজ প্রতিটি নাগরিকের জন্য উদযাপনের দিন। আমরা ক্ষমতা তার প্রকৃত মালিক- জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, তা আজ পূরণ করেছি।  এই নির্বাচন এবং ‘জুলাই সনদের’ উপর ভিত্তি করে আয়োজিত গণভোট নিশ্চিত করবে যে আমাদের গণতন্ত্র আর কেউ কখনও কেড়ে নিতে পারবে না।  আমি সকলকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে এই গণরায় গ্রহণ করার আহ্বান জানাই।  ‘

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান আজ সকালে ঢাকার গুলশানে তার নিজ ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে ভোট প্রদান করে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন- দীর্ঘ দুই দশকের লড়াই এবং ত্যাগের পর আজ দেশের মানুষ অবশেষে মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলছে।  এই ভোট কেবল একটি দলের জন্য নয়, বরং আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য।  আমরা আত্মবিশ্বাসী যে, জনগণ অতীতের অন্ধকার ছায়া পেছনে ফেলে একটি ‘নতুন বাংলাদেশ’ বেছে নিয়েছে।”

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ড. শফিকুর রহমান ঢাকা-১৫ আসনে মিরপুরের একটি নির্দিষ্ট ভোটকেন্দ্র প্রধান অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা এবং শৃঙ্খলিত নেতাকর্মীদের মাঝে নিজের ভোট প্রদান করেন।  ভোট প্রদান শেষে এক প্রতিক্রিয়ায় জামায়াত আমির জানান- ‘আমরা এক নজিরবিহীন জাগরণ দেখেছি।  মানুষ দুর্নীতি ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে।  আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ন্যায়বিচার ও সাম্যের ভিত্তিতে একটি সমাজ গঠন করা।  ফলাফল যাই হোক না কেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমরা সকল অংশীজনের সাথে মিলেমিশে কাজ করব।  ‘

বাংলাদেশ নামের বদ্বীপের বুকে সূর্য ডোবার সাথে সাথে শুরু হয়েছে ভোট গণনার কাজ।  সংসদীয় আসনের জন্য সাদা ব্যালট এবং গণভোটের জন্য গোলাপী ব্যালট- এই দ্বৈত পদ্ধতির কারণে চূড়ান্ত ফলাফল পেতে স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি সময় লাগতে পারে।  যদিও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নির্বাচনী দৌঁড়ে এগিয়ে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে ভোটারদের উচ্চ উপস্থিতি এবং তরুণ নেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও জামায়াতে ইসলামীর প্রভাব নির্দেশ করছে যে, গত কয়েক দশকের তুলনায় এবার একটি অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় ও ভারসাম্যপূর্ণ সংসদ গঠিত হতে যাচ্ছে।