‘নাও-বানাও-ফেলে দাও’ না, এখন ‘ নাও আবার বানাও’

জাহিদা পারভেজ ছন্দা (ঢাকা ব্যুরো)

দ্রুত নগরায়ন, ক্রমবর্ধমান বর্জ্য এবং জলবায়ু ঝুঁকির চাপে বাংলাদেশ এখন টেকসই প্রবৃদ্ধির বিকল্প পথ খুঁজছে। নীতিনির্ধারক ও পরিবেশ বিশ্লেষকদের মতে সার্কুলার ইকোনমি’ বা বৃত্তাকার অর্থনীতি হতে পারে সেই সম্ভাবনাময় মডেল।

‘নাও-বানাও-ফেলে দাও’ আমরা সাধারণত এভাবেই অভ্যস্ত। এই অভ্যস্ততা থেকে বেরিয়ে এসে অর্থনৈতিক কাঠামোর বিপরীতে সার্কুলার ইকোনমি জোর দেয় বর্জ্য কমানো, পণ্যের আয়ু বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের পুনর্জন্মের ওপর। জলবায়ু পরিবর্তন ও সম্পদ সংকটের প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে এই ধারণা ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে বলে জানান হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সার্কুলার ফ্যামিলি ইন বাংলাদেশ এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সমাজ বিজ্ঞানী ড. মো. মঞ্জুরে মাওলা।

ড. মাওলা বলেন, বাংলাদেশে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। রাজধানী ঢাকা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শহর- যেখানে প্রতিদিন লাখ লাখ টন আবর্জনা স্তুপ হয়। উৎপাদিত বর্জ্যের একটি বড় অংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য হলেও কার্যকর বর্জ্য পৃথকীকরণ ব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে তা পুনরুদ্ধার সম্ভব হচ্ছে না।

বিশেষ করে, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্তমানে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খুচরা বাজার ও অনলাইন ডেলিভারি খাতের সম্প্রসারণের ফলে প্লাস্টিক বর্জ্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা নদী দূষণ ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ‘এটি এখন একটি জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে’ যোগ করেন এই সমাজ বিজ্ঞানী ও সার্কুলার ফ্যামিলি ইন বাংলাদেশ এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ড. মো. মঞ্জুরে মাওলা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সার্কুলার অর্থনীতিতে রূপান্তর কেবল পরিবেশ সুরক্ষা নয়, নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করতে পারে। রিসাইক্লিং, রিপেয়ার সার্ভিস, টেকসই টেক্সটাইল উৎপাদন এবং বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন- এসব খাতে উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ছাড়া বিশ্ববাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান থাকা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থার চাপে রয়েছে। টেক্সটাইল পুনর্ব্যবহার, পানি ব্যবহার হ্রাস এবং সার্কুলার ডিজাইন এখন বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার অংশ হয়ে উঠছে।

সার্কুলারিটি এখন আর শুধু পরিবেশগত ইস্যু নয়; এটি এখন উন্নত জীবন গঠনের শর্তে পরিণত হচ্ছে। রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোকে টিকে থাকতে হলে এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। কারণ বিশ্ব বাজার এখন এই দিকেই এগুচ্ছে। এই খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনতে সুস্পষ্ট নীতিমালা, সবুজ বিনিয়োগে প্রণোদনা এবং উৎপাদকদের সম্প্রসারিত দায়িত্ব (Extended Producer Responsibility) নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন পরিবেশেবিদ ও সমাজ বিজ্ঞানীরা।

বাংলাদেশে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, জনসচেতনতার অভাব এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি- এসবই বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বর্তমানে বিবেচিত হচ্ছে । বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব এবং নিয়ন্ত্রক সংস্কার ছাড়া বৃহৎ পরিসরে এই রূপান্তর সম্ভব নয়।

জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশগত ক্ষয় রোধ করতে হচ্ছে। নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় সার্কুলার নীতিমালা অন্তর্ভুক্ত করা গেলে অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা ও পরিবেশ সুরক্ষা- দুই লক্ষ্যই একসঙ্গে অর্জন সম্ভব।

তবে এই রূপান্তর কেবল প্রযুক্তিগত পরিবর্তনই নয়; এটি উৎপাদন প্রক্রিয়া, পণ্যের নকশা এবং ভোক্তা আচরণ- সবকিছুর মধ্যে কাঠামোগত পরিবর্তনও দাবি করে।
তাই সম্পদ সংকট ও জলবায়ু ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে এখন আর সার্কুলার অর্থনীতি প্রয়োজন কি না- এই প্রশ্নের ওপর সীমাবদ্ধ নেই, বরং কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে তা বাস্তবায়ন করা যায় সেই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহলের এগিয়ে আসা জরুরি বলে মনে করছেন পরিবেশবিদগণ।

ক্রমবর্ধমান বর্জ্য, প্লাস্টিক দূষণ ও প্রাকৃতিক সম্পদের সংকটের প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব পাচ্ছে ‘সার্কুলার ইকোনমি’ বা বৃত্তাকার অর্থনীতি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেকসই উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশকেও এই মডেলের দিকে ঝুঁকতে হবে।

সার্কুলার ইকোনমি এমন একটি অর্থনৈতিক পদ্ধতি, যেখানে পণ্য একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয় না; বরং পুনর্ব্যবহার, মেরামত, রিসাইকেল ও পুনরুৎপাদনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ব্যবহারযোগ্য করা হয়। পরিবেশবিদদের মতে, দেশে প্রতিদিন লাখ লাখ টন বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। এর একটি বড় অংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য হলেও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে তা পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সার্কুলার ইকোনমি বাস্তবায়ন করা গেলে শুধু পরিবেশ নয়, নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে। বিশেষ করে পোশাক শিল্প, প্লাস্টিক শিল্প ও ইলেকট্রনিক বর্জ্য খাতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে এই মডেল কার্যকর করতে প্রয়োজন নীতিমালা, সচেতনতা ও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ। বিশেষজ্ঞদের মত ‌’ফেলে দেওয়ার সংস্কৃতি’ বদলে ‌’পুনর্ব্যবহারের সংস্কৃতি’ গড়ে তুলতে পারলেই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।

জাহিদা পারভেজ ছন্দাঃ করেসপন্ডেন্ট, প্রেসেঞ্জা- ঢাকা ব্যুরো।