বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ২০ বছর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে দলটি এখন সরকার গঠনের পথে। নির্বাচনের সর্বশেষ ফলাফল অনুযায়ী, ২৯৯টি সংসদীয় আসনের মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি আসনে জয়লাভ করেছে, যার মধ্যে এককভাবে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে ২০৯টি আসনে জয় পেয়েছে বিএনপি।
রাজকীয় প্রত্যাবর্তন ও তারেক রহমান ম্যাজিক
নির্বাচনের এই ফলাফল বাংলাদেশে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। বিশেষ করে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জন্য এটি এক অভাবনীয় রাজনৈতিক বিজয়। দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত ২৫শে ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তিনি। ৩০শে ডিসেম্বর মা বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের পূর্ণ দায়িত্ব (দলের সভাপতি) কাঁধে তুলে নেন তারেক রহমান।
এবারের নির্বাচনে তিনি নিজেই প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ঢাকা ও বগুড়ার দুটি সংসদীয় আসন থেকে তিনি বড় ব্যবধানে জয়ী হন। বিএনপির পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান হিসেবে মিঃ রহমানই হতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।
নির্বাচনের চালচিত্র: মিত্র যখন প্রতিদ্বন্দ্বী
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এটিই ছিল দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। এবারের নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
বিএনপি জোটের ২১২ আসনের (বিএনপি এককভাবে ২০৯) বিপরীতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত জোট ৭৮ আসন (জামায়াতে ইসলামী এককভাবে ৬৮) আসন পেয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে।
নির্বাচনের পাশাপাশি দেশে একটি গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়, যা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগের অংশ ছিল।
‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’: ভূ-রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ
তারেক রহমান দেশে ফেরার পর তার প্রথম জনসমাবেশেই মার্টিন লুথার কিং-এর সুর মিলিয়ে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। এখন বিশ্বনেতাদের নজর মি. রহমানের সেই পরিকল্পনার দিকে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের এই পটপরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শুক্রবার সকালেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাকে অভিনন্দন জানিয়ে বার্তা পাঠিয়েছেন। চীন ও পাকিস্তানের আগেই দিল্লির এই দ্রুত অভিনন্দন বার্তা বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ভারতের জন্য এই নির্বাচন ছিল কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। দিল্লির মূল উদ্বেগের জায়গা হলো- বাংলাদেশ কি পাকিস্তান বা চীনের বলয়ের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়বে, নাকি ভারসাম্য বজায় রাখবে?
বিশ্লেষকদের অভিমত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের নতুন সরকার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় পরীক্ষা। একদিকে যেমন ভারতের সাথে নিরাপত্তা ও সীমান্ত ইস্যু রয়েছে, অন্যদিকে ৫ আগস্ট পরবর্তী বাস্তবতায় পাকিস্তান ও চীনের সাথে সম্পর্কের নতুন মাত্রা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই ‘স্নায়ু যুদ্ধে’ তারেক রহমান কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করেন, তার ওপরই নির্ভর করছে দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা মানচিত্র।

