দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর বাংলাদেশে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের লক্ষ্যে ভোটের মাঠের প্রচার-প্রচারণা জমে উঠেছে। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সারাদেশে এখন উৎসব এবং উৎকণ্ঠার এক মিশ্র আবহ তৈরী হয়েছে। একদিকে ভোটারদের মন জয়ে প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতির ‘ফুলঝুড়ি’, অন্যদিকে রাজপথে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতা এবং কৌশলী ধর্মীয় প্রচার- সব মিলিয়ে বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতি এক জটিল সমীকরণে এসে দাঁড়িয়েছে।
দুই বছর আগে বাংলাদেশের রাজপথে যে উত্তাল গণঅভ্যুত্থান ঘটেছিল, তার চূড়ান্ত গন্তব্য ছিল একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা যখন সপ্তাহ গড়িয়েছে, তখন বিশ্ববাসীর নজর এখন ঢাকার দিকে। প্রশ্ন উঠছে- বাংলাদেশ কি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে, নাকি পুরনো ‘সহিংসতা ও মেরুকরণের’ বৃত্তেই আটকে যাচ্ছে?
প্রচারণা শুরুর মাত্র এক সপ্তাহ পার হতেই রাজধানী ঢাকাসহ অন্তত ২০টি জেলায় ছোট-বড় সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। বিশেষ করে দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থান দেখা দিচ্ছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অনেক এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা এবং নির্বাচনী ক্যাম্পে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় নির্বাচনী সহিংসতায় দেশজুড়ে শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন- ২০২৪ পরবর্তী বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মাঠের চিত্র বলছে সংস্কৃতির পরিবর্তন এখনো বহুদূর। প্রচারণার প্রথম সপ্তাহেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া সংঘাত নির্দেশ করছে যে, পেশিশক্তি এখনো নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার অন্যতম হাতিয়ার। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ও পারস্পরিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই গণতন্ত্রের জন্য একটি অশনিসংকেত।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘ধর্মীয় আবেগ’কে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে জনতুষ্টিবাদী আচরণের পাশাপাশি ধর্মীয় কার্ড ব্যবহারের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি প্রকট ওয়ে উঠেছে। অনেক প্রার্থী মসজিদের খুতবা কিংবা ওয়াজ মাহফিলকে পরোক্ষভাবে প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। ’ধর্ম রক্ষা’ এবং ‘আকিদা’ ভিত্তিক স্লোগান দিয়ে গ্রামীণ ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে ডানপন্থী দলগুলো এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভোটারদের ‘ইমানি দায়িত্ব’ মনে করিয়ে দিয়ে ভোট চাইছেন, যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও উসকে দিচ্ছে।
এ ব্যাপারে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ প্রেস এজেন্সি- প্রেসেঞ্জাকে বলেন, ‘সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মের কৌশলগত ব্যবহার। যখন প্রার্থীরা জনসেবা বা নীতির বদলে ভোটারদের ‘ধর্মীয় অনুভূতি’ বা ‘পরকাল’- এর ভয় দেখিয়ে ভোট আদায়ের চেষ্টা করেন, তখন নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্য- অর্থাৎ জনম্যান্ডেট- ক্ষুণ্ণ হয়। আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের যে অসাম্প্রদায়িক এবং উদার ভাবমূর্তি রয়েছে, নির্বাচনী মাঠে ধর্মীয় কার্ডের অতি-ব্যবহার সেই ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। এটি কেবল ভোটারদের বিভক্তই করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে উগ্রবাদী চিন্তাধারার প্রসারে ইন্ধন দেয়।’
এদিকে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে এবার সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে সুশাসন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক সংস্কার। দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল) তাদের প্রচারণায় ১ কোটি তরুণকে কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্ররা একটি ‘ন্যায়ভিত্তিক’ সমাজ ব্যবস্থা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করার অঙ্গীকার করছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সংগে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করা এবং ২০২৪-এর বিপ্লব থেকে উঠে আসা ‘জাতীয় নাগরিক দল’ (NCP) প্রথাগত রাজনীতির বাইরে ‘সিস্টেম চেঞ্জ’- এর স্লোগান দিচ্ছে, যা তরুণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা (ANFREL) এবং জাতিসংঘ (UNDP) ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের প্রধান উদ্বেগের বিষয় হলো সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল স্পেসে ছড়িয়ে পড়া অপপ্রচার (Disinformation)। ৮৯% সাংবাদিক শারীরিক হামলার আশঙ্কায় থাকায় স্বাধীন সাংবাদিকতা এখানে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগের শিক্ষক তৌহিদুল ইসলাম মনে করেন- ‘এই নির্বাচন কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র। একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ এই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য। নির্বাচন কমিশন এবং অন্তর্বর্তীকালীন কাঠামোকে এটি নিশ্চিত করতে হবে যে, কোনো বিশেষ মতাদর্শ বা গোষ্ঠী যেন পেশিশক্তির জোরে ভোটারদের ইচ্ছাকে হরণ করতে না পারে।’
‘বাংলাদেশের এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের লড়াই নয়, বরং ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা কতটা বাস্তবায়িত হবে তার একটি এসিড টেস্ট। যদি সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ না করা যায় এবং ধর্মীয় মেরুকরণ তীব্র হয়, তবে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়তে পারে’ যোগ করেন মিস্টার ইসলাম।

