স্বাধীন নিরাপদ খাদ্য কমিশন’ গঠনের দাবি
মোহাম্মদ কাওসার আহমেদ (ঢাকা ব্যুরো)
এক নীরব ঘাতক ছড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের পাতে। চাল, ডাল, মাছ থেকে শুরু করে শিশুদের গুঁড়ো দুধ- সবখানেই হানা দিয়েছে বিষাক্ত রাসায়নিক। এই ভয়াবহ খাদ্যদূষণকে ‘মানবিক বিপর্যয়’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিরোধী দলীয় নেতা এবং সংসদ সদস্যদের প্রতি একটি জরুরি খোলা চিঠি দিয়েছেন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীরা। তাদের প্রধান দাবি- একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও শক্তিশালী ‘নিরাপদ খাদ্য কমিশন’ গঠন।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের খাদ্যশৃঙ্খলে এমন সব উপাদান মিশেছে যা কল্পনাকেও হার মানায়। প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা চারটি প্রধান বিষাক্ত উপাদানের কথা উল্লেখ করেছেনঃ
হেভি মেটালঃ খাদ্যদ্রব্যে উচ্চমাত্রায় সীসা (Lead), ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
কীটনাশক রেসিডিউঃ শাকসবজি ও ফলে সহনীয় মাত্রার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি কীটনাশক ব্যবহৃত হচ্ছে।
তেজস্ক্রিয় উপাদানঃ ভূগর্ভস্থ পানি ও নির্দিষ্ট কিছু খাদ্যপণ্যে ইউরেনিয়াম, রেডিয়াম ও থোরিয়ামের মতো তেজস্ক্রিয় উপাদানের অস্তিত্ব মিলেছে।
পিফাস (PFAS)ঃ ‘ফরএভার কেমিক্যাল’ নামে পরিচিত এই বিষাক্ত উপাদান এখন বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চল সংলগ্ন জলাশয়ের মাছেও দৃশ্যমান।
আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, ঢাকা ওয়াসার সরবরাহকৃত পানি এবং বাজারে প্রচলিত শিশুখাদ্যেও এই বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি প্রমাণিত হয়েছে। এমনকি উচ্চপর্যায়ের সরকারি বৈঠকে পরিবেশিত চা-ও এই দূষণমুক্ত নয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
খাদ্যদূষণের সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের জনস্বাস্থ্যের ওপর। অসংক্রামক ব্যাধি (NCDs) এখন বাংলাদেশে মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভেঙে পড়েছে দেশের জনস্বাস্থ্য খাত। হাসপাতালগুলোতে রোগীর উপচে পড়া ভিড় পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে খাদ্য দূষণের তিনটি ভয়াবহ দৃশ্য উঠে এসেছে। এরমধ্যে অন্যতম তিনটি আতংকের বিষয় হচ্ছে-
১। শিশু স্বাস্থ্য বিপর্যয়ঃ ক্যানসার ও কিডনি রোগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়েছে।
২। জেনেটিক সংকটঃ অনেক শিশু জন্মগত ত্রুটি এবং ভয়াবহ ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ নিয়ে জন্মাচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
৩। তরুণ প্রজন্মের অকাল মৃত্যুঃ খাদ্যে মেশানো রাসায়নিকের প্রভাবে ২০-৪০ বছর বয়সীদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক ও ব্রেইন স্ট্রোকের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
নিরাপদ খাদ্য আন্দোলনের অ্যাক্টিভিস্ট এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে- ‘যদি বিদ্যমান ব্যবস্থা কার্যকর হতো, তবে আজ আমাদের মাটি ও পানি বিষাক্ত হতো না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং প্রশাসনিক অবহেলাই এই সংকটের মূল কারণ।’
প্রশ্ন উঠেছে- দেশে বিরাজমান ‘নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’ থাকা সত্ত্বেও কেন এই বিপর্যয়? আন্দোলনকারীদের মতে, বর্তমান সংস্থাগুলোর সীমাবদ্ধতা ও সমন্বয়হীনতাহীনতাই এর জন্য দায়ী। এজন্য তারা সরকারের কাছে নির্দিষ্ট কিছু দাবি পেশ করেছেন। এরমধ্যে রয়েছে-
১। সংস্কার কমিটি গঠনঃ দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করতে হবে, যারা বর্তমান ব্যবস্থার ব্যর্থতা ও কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতা তদন্ত করবে।
২। স্বচ্ছতা ও ল্যাব টেস্টঃ একাধিক আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃত ল্যাবে খাদ্যপণ্য পরীক্ষা করে তার ফলাফল সরাসরি জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে।
৩। কঠোর আইন প্রয়োগঃ কমিশনকে এমন ক্ষমতা দিতে হবে যাতে তারা উৎপাদনকারী থেকে শুরু করে সরবরাহকারী- যেকোনো পর্যায়ে দূষণকারীর বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারে।
প্রতিবেদনের শেষে একটি শক্তিশালী বার্তা দেওয়া হয়েছে- ‘নিরাপদ খাদ্য কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি মৌলিক মানবাধিকার।’ নাগরিক সমাজ এখন সরকারকে প্রশ্ন করছে, তাদের করের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্র তাদের সন্তানদের নিরাপদ খাবারের নিশ্চয়তা দিতে পারছে কি না?
বাংলাদেশের এই খাদ্য সংকট এখন আর কেবল স্থানীয় ইস্যু নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি এখন ঢাকা’র নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তের দিকে।

মোহাম্মদ কাওসার আহমেদ ঃ ষ্টাফ করেসপন্ডেন্ট এন্ড হেড অফ এডমিন, প্রেসেঞ্জা- ঢাকা ব্যুরো।

