গত শনিবার ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসী হামলা এবং দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ও রাষ্ট্রপ্রধানের হত্যাকাণ্ডের পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যে যুদ্ধের দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে, তার উত্তাপ এখন দক্ষিণ এশিয়ার উপকূলেও পৌঁছাতে শুরু করেছে। বিশ্বসভ্যতা ও বৈশ্বিক মানবিকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চালানো এই মার্কিন আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায় ইরান পাল্টা প্রতিরোধ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। এই সংঘাত কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য এক বিশাল ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো।

এর ফলে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৩তম জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন প্রশাসন এক ভয়াবহ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দুর্বল অর্থনীতি এবং নাজুক জ্বালানি খাতের ওপর এই যুদ্ধ ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রধান হাতিয়ার ছিল প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সের সিংহভাগ আসে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত এবং ওমানের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ এই রেমিট্যান্স প্রবাহ ব্যাহত করলে তা সরাসরি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় আঘাত হানবে।

বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেল, এলএনজি এবং এলপিজি-র জন্য মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমান সামরিক উত্তেজনা বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থা তছনছ করে দিতে পারে। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরে পরিবহন খরচ এবং নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গিয়ে চরম মূল্যস্ফীতি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এই ঘটনায় ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করে সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। ঢাকা স্পষ্ট করেছে যে, সামরিক শক্তির আস্ফালন নয়, বরং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব। বাহরাইন, ইরাক ও জর্ডানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিন্দা জানিয়ে বাংলাদেশ তার দীর্ঘস্থায়ী জোট-নিরপেক্ষ নীতির ওপর অটল থাকার বার্তা দিয়েছে।

তবে পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক হিসাব অত্যন্ত জটিল। নির্বাচনের ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ। আবার অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে রয়েছে ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক বন্ধন। সাবেক কূটনীতিকদের মতে, পশ্চিমা অংশীদার এবং মুসলিম বিশ্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার এই খেলায় এবার ভুলের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। শ্রম ও কর্মসংস্থান সিভিল এভিয়েশন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন বিভাগ এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে কাজ করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেনের মতে, ‘এটি এই সরকারের জন্য এক বিশাল পরীক্ষা। অংশীদারদের মধ্যে যখন বিভেদ তৈরি হয়, তখন সঠিক সুর বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন কাজ। ‘

উপসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক কম্পন বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি সংবাদ নয়, এটি মুদ্রার অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকটের এক অশনি সংকেত। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যতই ঘনীভূত হচ্ছে, বাংলাদেশের নেতৃত্বকে প্রতিটি কথা এবং পদক্ষেপ মেপে নিতে হচ্ছে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সরবরাহের মতোই সুচিন্তিত কূটনীতিই এখন বাংলাদেশের জন্য শ্রেষ্ঠ জীবনরেখা বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সাব্রিনা খানঃ করেসপন্ডেন্ট, প্রেসেঞ্জা- ঢাকা ব্যুরো।