আসিফ শওকত কল্লোল (ঢাকা ব্যুরো)

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জমে থাকা ঋণের পাহাড়ের চাপে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এক গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। একসময় যা উন্নয়ন-মুখী ঋণ গ্রহণের কৌশল হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল, তা এখন একটি কাঠামোগত বোঝায় পরিণত হয়েছে। এটি রাষ্ট্রকে নতুন ঋণের মাধ্যমে পুরনো ঋণ পরিশোধের এক চক্রে বাধ্য করছে- যাকে অর্থনীতিবিদরা ‘অসহনীয়’ বলে সতর্ক করেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট সরকারি ঋণ ২২.৮ ট্রিলিয়ন টাকা (১৬৫ বিলিয়ন পাউন্ড) ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রায় ১১.৩৯ ট্রিলিয়ন টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ১১.৭৭ ট্রিলিয়ন টাকায় পৌঁছেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় মোট ঋণ ছিল প্রায় ১৯.২৩ ট্রিলিয়ন টাকা। অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের অধীনে মাত্র ১৮ মাসে এই দায়ভার আরও ৩.৫৮ ট্রিলিয়ন টাকার বেশি বেড়েছে- এটিই প্রথমবার যেখানে বার্ষিক নিট ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ৩ ট্রিলিয়ন টাকা ছাড়িয়েছে।

এই দ্রুত বৃদ্ধির কারণ নীতিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, বরং আর্থিক বাধ্যবাধকতা। বর্তমান ঋণের একটি বিশাল অংশ নতুন কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য নয়, বরং আগের বছরগুলোতে নেওয়া বিশেষ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং অবকাঠামো খাতের মেগা প্রকল্পগুলোর কিস্তি ও সুদ পরিশোধে ব্যবহৃত হচ্ছে। কার্যত, সরকার সচল থাকার জন্যই ঋণ নিচ্ছে।

গত দেড় বছরে সংস্কার কর্মসূচি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখার উদ্দেশ্যে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফসহ বহুপাক্ষিক ঋণদাতাদের কাছ থেকে ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ নিয়েছে বাংলাদেশ। একই সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী এবং জ্বালানি সরবরাহকারীদের বকেয়া হিসেবে প্রায় ২.৫ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে- যা মূলত স্বচ্ছতাহীন চুক্তি এবং ক্যাপাসিটি পেমেন্টের মাধ্যমে বছরের পর বছর ধরে চলা আগ্রাসী জ্বালানি খাতের প্রসারের উত্তরাধিকার।

সামনে যা আসছে তা আরও ভয়াবহ। ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে বাংলাদেশ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কিস্তি পরিশোধ শুরু করবে, যার খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.৩৯ ট্রিলিয়ন টাকায়। উত্তরা-মতিঝিল মেট্রো রেলের বার্ষিক কিস্তি ২০৬১-৬২ সাল পর্যন্ত গড়ে ৬.৫৭ বিলিয়ন টাকা হবে। এছাড়া এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে নির্মিত কক্সবাজার রেল সংযোগের ঋণ পরিশোধ ২০২৮ সাল থেকে বার্ষিক ৬.৬ বিলিয়ন টাকায় পৌঁছাবে।

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘এগুলো স্বল্পমেয়াদী কোনো চাপ নয়। যদি কর আদায় এবং রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত না হয়, তবে ঋণের বোঝা কমানো প্রায় অসম্ভব হবে। সরকার ক্রমবর্ধমান ঋণ পরিশোধ এবং বর্ধিত চলতি ব্যয়ের মাঝখানে আটকা পড়েছে। ’

এই ফাঁদ ক্রমশ শক্ত হচ্ছে। ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন সরকারি খাতের বেতন বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভর্তুকি এবং অর্থনৈতিক কষ্ট লাঘবে সামাজিক ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান দাবি মোকাবিলা করছে। রাজস্ব প্রবৃদ্ধি স্থবির এবং কর বিধিবিধান পালনে দুর্বলতার কারণে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে।

আপাতত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা মূলত তত্ত্বাবধায়কের। কিন্তু বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, প্রকৃত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ শুরু হবে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর, যখন একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেবে। সেই প্রশাসন কেবল শাসনের ক্ষমতাই পাবে না, বরং ঋণের সেই পূর্ণ ভারও কাঁধে নেবে- যা তাদের পুরো মেয়াদকে প্রভাবিত করবে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ঋণের একটি বড় অংশ এমন সব প্রকল্পের সাথে যুক্ত যেগুলোর অর্থনৈতিক সুফল এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। মেগা প্রকল্পগুলোকে দীর্ঘকাল আধুনিকায়নের প্রতীক হিসেবে প্রচার করা হলেও, এগুলোর ঋণ পরিশোধের সূচি এমন এক সময়ে পড়েছে যখন প্রবৃদ্ধি ধীর, রিজার্ভ চাপে এবং রপ্তানি বৈচিত্র্য সীমিত। বিশ্ববাজারে সুদের হার চড়া থাকায় বৈদেশিক ঋণের খরচও বেড়েছে, যা সরকারি অর্থ ব্যবস্থাকে আরও চাপে ফেলছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দাবি, তাদের হাতে বিকল্প খুব কম। খেলাপি হওয়া কোনো পথ নয়, আবার উন্নয়ন ব্যয় কমানো মানে অর্থনৈতিক স্থবিরতা আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকি নেওয়া। তবুও আগের ঋণ শোধ করার জন্য নতুন করে ঋণ নেওয়া কেবল সমস্যাটিকে সাময়িকভাবে পিছিয়ে দিচ্ছে এবং এর আকার আরও বড় করছে।

বাংলাদেশ যা মোকাবিলা করছে তা কেবল আর্থিক ভারসাম্যহীনতা নয়, বরং একটি সুশাসনের চ্যালেঞ্জ। বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ঋণ গ্রহণ, দুর্বল তদারকি, প্রকল্পের বর্ধিত ব্যয় এবং অপর্যাপ্ত রাজস্ব সংস্কার রাষ্ট্রকে অরক্ষিত করে তুলেছে। ঋণ, যা একসময় ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে দেখানো হয়েছিল, এখন সেই ভবিষ্যৎকেই নিয়ন্ত্রণ ও সংকুচিত করছে।

পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য বিপদটি স্পষ্ট। কর নীতি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রকল্প নির্বাচনে আমূল সংস্কার ছাড়া ঋণ পরিশোধের চাপ দেশের উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা এবং রাজনৈতিক লক্ষ্য- সবকিছুকেই গ্রাস করবে। বিপদ (আইসবার্গ) ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। বাংলাদেশ ধাক্কা লাগার আগে পথ পরিবর্তন করতে পারবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।

————————
আসিফ শওকত কল্লোল: হেড অফ নিউজ, দ্য মিরর এশিয়া এবং কন্ট্রিবিউটর, প্রেসেনজা- ঢাকা ব্যুরো।