বেকারত্বের ভারে জর্জরিত বাংলাদেশ! পড়াশুনা শেষ করে কাজ পাচ্ছে না দেশের শিক্ষিত যুব সম্প্রদায়। শিক্ষিত বেকারত্ব আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে জটিল সামাজিক–অর্থনৈতিক সংকটগুলোর একটি। শিক্ষিত বেকারের মধ্যে নারীদের হার পুরুষদের তুলনায় বেশি। শিক্ষিত নারীদের বেকারত্বের হার প্রায় ২০%-এর উপরে। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে যারা অন্তত দুই বছর ধরে কাজ খুঁজছেন, কিন্তু পাচ্ছেন না- এমন দীর্ঘমেয়াদী বেকারের সংখ্যাও বাড়ছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক পরিচালিত সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ-এ দেখা গেছে- যাদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই তাদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে কম (১.২৫%), অথচ শিক্ষার স্তর যত বাড়ছে, বেকারত্বের হারও তত বাড়ছে। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় ১৩.৫৪%। অর্থাৎ, প্রতি ১০০ জন স্নাতক ডিগ্রিধারীর মধ্যে প্রায় ১৪ জনই বেকার। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এই চিত্র আরো ভয়াবহ আকার ধারন করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্ন্তবর্তীকালিন সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাওয় হলে তিনি বলেন যে- ‘রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশের অর্থনীতিতে মন্দাভাব দেখা যাচ্ছে। কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ হচ্ছে না। ফলে কর্মসংস্থান ব্যাহত হচ্ছে। ’

২০২৪ সালের আগষ্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের (ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান) পর নোবেল বিজয়ী ডঃ মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন একটি অন্তবর্তীকালিন সরকার বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থা পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহন করে। সে সময় ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা পুরোপুরী ভেঙে পড়েছিলো। রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর অন্তবর্তীকালিন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিলো দেশের ভেঙে পড়া আইন-শৃঙ্খলা পূনরুদ্ধার করা। ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ তারা গ্রহন করতে পারেনি। তবে, গত প্রায় দেড় বছরে সেনাবাহিনীর সহায়তায় দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির লক্ষনীয় উন্নতি করার মাধ্যমে অন্তবর্তীকালিন সরকার একটি অবাধ ও সুষ্ঠ জাতীয় নির্বাচনের রোড ম্যাপ ঘোষনা করেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে এবং অনাকাঙ্খিত কোন জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি না হলে- আগামী ১২ ফেব্রুয়ারী বাংলাদেশে একটি সাধারণ নির্বাচন (ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ) অনুষ্ঠিত হবে এবং নব নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহন করবে।

তবে, ২০২৬ সালের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নব নির্বাচিত সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে- ‘শিক্ষিত বেকারত্ব’। হাজার হাজার তরুণ হাতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের সনদ নিয়ে কাজের সন্ধানে ঘুরছেন, কিন্তু বর্তমান শ্রমবাজার তাঁদের গ্রহণ করতে পারছে না। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সনদ আছে, কিন্তু দক্ষতা কই? বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের মধ্যে একটি বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়েছে। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ তরুণ ডিগ্রি অর্জন করলেও তাঁদের বড় অংশই আধুনিক করপোরেট বা প্রযুক্তি খাতের জন্য উপযুক্ত নন। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকার যদি অবিলম্বে ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া পার্টনারশিপ নিশ্চিত না করে এবং পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন না করে, তবে এই শিক্ষিত জনশক্তি দেশের জন্য ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর বদলে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিজাস্টার’ হয়ে দাঁড়াবে। সরকারি চাকরির মোহ ও বেসরকারি খাতের অনিশ্চয়তার একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণদের একটি বিশাল অংশ বছরের পর বছর কেবল সরকারি চাকরির প্রস্তুতির পেছনে ব্যয় করছে। এর মূল কারণ বেসরকারি খাতে চাকরির অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক মর্যাদার অভাব।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক এবং বর্তমানে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ড. রিজওয়ানুল ইসলাম বলেন,
শিক্ষিত বেকারত্বের এই পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত হতাশা নয়; এটি রাষ্ট্রের উৎপাদনশীলতা, সামাজিক স্থিতি ও রাজনৈতিক আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ও শ্রমবাজার গবেষক এই শিক্ষকের মতে, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে তাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত- এই সংকটকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে সমাধান করা। নির্বাচিত সরকারকে বেসরকারি খাতের ন্যূনতম মজুরি কাঠামো এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে হবে, যাতে তরুণরা উদ্যোক্তা হতে বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে উৎসাহিত হয়।

সংকট উত্তরণে নির্বাচিত সরকারের করণীয় হিসেবে বিশেষজ্ঞরা ৫টি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করেছেনঃ

১. শিক্ষা ও শ্রমবাজারের সমন্বয় ঘটানো। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে ডিগ্রি বের হচ্ছে, বাজারে তার চাহিদা নেই- এই ফাঁক বন্ধ করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে শ্রমবাজারের চাহিদা নিরূপণ করে সিলেবাস হালনাগাদ, ইন্ডাস্ট্রি–অ্যাকাডেমিয়া পার্টনারশিপ এবং বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ চালু করতে হবে,
২। দক্ষতা–ভিত্তিক কর্মসংস্থান নীতি। চাকরির সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি তরুণদের বাজারযোগ্য দক্ষতায় গড়ে তুলতে হবে। আইটি, ডেটা অ্যানালিটিক্স, এআই, সাইবার সিকিউরিটি, গ্রিন এনার্জি, কেয়ার ইকোনমি- এমন খাতে স্বল্পমেয়াদি কিন্তু মানসম্মত প্রশিক্ষণ রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করা জরুরি,
৩। সরকারি চাকরিকেন্দ্রিক মানসিকতা ভাঙা। সবাই সরকারি চাকরির পেছনে ছুটলে বেকারত্ব বাড়ে। বেসরকারি খাতে ন্যূনতম মজুরি, চাকরির নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করে এসব চাকরিকে সম্মানজনক করতে হবে,
৪। উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপে বাস্তব সহায়তা দিতে হবে। তরুণদের উদ্যোক্তা বানাতে সহজ শর্তে ঋণ, কর–ছাড়, ব্যর্থ হলেও পুনরায় সুযোগ এবং জেলা–উপজেলায় ইনকিউবেশন সেন্টার গড়ে তুলতে হবে। ঝুঁকি শুধু তরুণের নয়- রাষ্ট্রকেও ভাগ নিতে হবে,
৫। স্বচ্ছ নিয়োগ ও মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দলীয় প্রভাব, কোটা–দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতা বন্ধ না হলে মেধাবীরা হতাশ হবেই। প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নিয়োগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে,
৬। দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিতে উদ্যোগ নিতে হবে। ডিগ্রি নয়, দক্ষতা রপ্তানি করতে হবে। সরকার–টু–সরকার চুক্তির মাধ্যমে ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে শিক্ষিত তরুণদের বিদেশে দক্ষ কর্মী হিসেবে পাঠাতে হবে, এবং
৭। ডেটা–ভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়ন। দেশে কতজন শিক্ষিত বেকার, কোন দক্ষতায়, কোন জেলায়- এই তথ্য ছাড়া কার্যকর নীতি হয় না। একটি জাতীয় কর্মসংস্থান ড্যাশবোর্ড চালু করে চাহিদা–যোগান মিলিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে।

শেষ কথা হচ্ছে, শিক্ষিত বেকারত্ব তরুণদের ব্যর্থতা নয়; এটি রাষ্ট্রের নীতিগত ব্যর্থতার ফল। নির্বাচিত সরকার যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিক সংস্কার নিশ্চিত করতে পারে, তবে শিক্ষিত তরুণ আর বোঝা থাকবে না- হবে দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং ধারাবাহিক সংস্কারের মাধ্যমে যদি এই বিশাল শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা যায়, তবেই বাংলাদেশ তার প্রকৃত অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অর্জন করতে পারবে।