দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে উত্তপ্ত ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত। বিশেষ করে ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেন’স নেক’ অঞ্চলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর নজিরবিহীন তৎপরতা এবং এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক পদক্ষেপ- দুই দেশের সম্পর্কের এক জটিল সন্ধিক্ষণকে নির্দেশ করছে।
পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি করিডোর, যা মাত্র ২২ কিলোমিটার চওড়া একটি ভূখণ্ড। এটি ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আটটি রাজ্যের একমাত্র সংযোগস্থল। ভারতের প্রতিরক্ষা কৌশলে এটি সবচেয়ে স্পর্শকাতর পয়েন্ট।
অতি সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের চোপড়ায় ভারতীয় সেনাবাহিনী একটি স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে। এছাড়া বিহারের কিষাণগঞ্জ এবং আসামের ধুবড়িতে নতুন গ্যারিসন ও ইনফ্যান্ট্রি ইউনিট মোতায়েন করা হয়েছে।
প্রথাগতভাবে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BSF)-এর হলেও, বর্তমানে এই করিডোর রক্ষায় সরাসরি সেনাবাহিনীর ‘কোর’ পর্যায়ের মুভমেন্ট লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভারতের দাবি, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার সুযোগে এই সরু করিডোরটি যেন কোনো হুমকির মুখে না পড়ে, তাই এই আগাম সতর্কতা।
সীমান্তের এত কাছে এবং ‘চিকেন’স নেক’ সংলগ্ন উত্তরের জেলাগুলোর (যেমন পঞ্চগড়, নীলফামারী) ওপারে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও সেনাসদস্যদের আনাগোনায় ঢাকা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ সরকার মনে করছে, সীমান্তের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত করে এভাবে সামরিকায়ন প্রতিবেশী সুলভ আচরণের পরিপন্থী। বাংলাদেশের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে এই সামরিক তৎপরতা এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। ঢাকা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতির জন্য সীমান্তে সেনাবাহিনীর বদলে বিএসএফ-বিজিবি’র সমন্বয়ই শ্রেয়।
সীমান্ত পরিস্থিতি এবং ভারতের সাথে বিদ্যমান অন্যান্য বিরোধের জেরে দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় তলব করা হয়েছে।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের সাথে আলোচনার জন্য তাকে তলব করা হলেও, কূটনৈতিক ভাষায় একে ‘প্রতিবাদ’ বা ‘কঠোর অবস্থান’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে ক্রমাগত উদ্বেগ প্রকাশ এবং সীমান্তে ভারতীয় সেনার সক্রিয়তা- এই দুটি বিষয়ে বাংলাদেশ তার পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করতেই রাষ্ট্রদূতকে ফিরিয়ে এনেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত ‘চিকেন’স নেক’ করিডোরকে কেন্দ্র করে তাদের নিরাপত্তা বলয় এমনভাবে তৈরি করতে চাইছে, যাতে বাংলাদেশের যে কোনো পরিস্থিতির প্রভাব ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে না পড়ে। তবে এই অতি-সতর্কতা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রদূতকে তলব করার মধ্য দিয়ে ঢাকা বুঝাতে চাইছে যে, একতরফা কোনো চাপ বা সামরিক ভীতি প্রদর্শন সম্পর্কের উন্নয়নে সহায়ক হবে না।
বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন- ‘চিকেন’স নেক’ অঞ্চলের নিরাপত্তা ভারতের জন্য যতটা কৌশলগত, বাংলাদেশের জন্য সীমান্তের স্বাভাবিকতা বজায় রাখা ততটাই মৌলিক। বর্তমানে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যকার এই আস্থার সংকট নিরসনে দ্রুত কূটনৈতিক সংলাপ প্রয়োজন। অন্যথায়, সীমান্তে এই সামরিক শক্তিবৃদ্ধি দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘদিনের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগের শিক্ষক তৌহিদুল ইসলাম মনে করেন, সীমান্ত উত্তেজনা নিরসনে এবং দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে- দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সংবেদনশীলতা বিবেচনায় নিয়ে উভয় পক্ষকে উস্কানিমূলক বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে হবে।
তিনি বলেন, এক্ষেত্রে বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে বিদ্যমান ‘মৈত্রী চুক্তি’ বা এ ধরনের অন্যান্য সমঝোতা স্মারকের মূল চেতনাকে ধারণ করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘অবশ্যই পালনীয়’ নীতি অনুসরণ করে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের আইনি ও নৈতিক ভিত্তি সুসংহত করা প্রয়োজন। নিয়মিত এবং ফলপ্রসূ আলোচনার মাধ্যমে ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে হবে। এটি কেবল আনুষ্ঠানিক বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সরকারি পর্যায় এবং বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজ-এর মাধ্যমে সংলাপে গতিশীলতা আনতে হবে।
কারন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ এবং ভারত উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাই সীমান্তে উত্তেজনা কমিয়ে বা দ্বন্দ্ব রূপান্তরের মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি, যা দু’দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য’ যোগ করেন মিস্টার তৌহিদুল ইসলাম।

