বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে নারীর অংশগ্রহণ ছিল অগ্রণী। রাজধানীর রাজপথ থেকে শুরু করে রোকেয়া হলের গেট ভেঙে বেরিয়ে আসা ছাত্রীদের সেই সাহসী ভূমিকা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল এবং মন্ত্রিসভার গঠন সেই প্রত্যাশায় বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ার বদলে উল্টো সংকুচিত হয়েছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এয়োদশ জাতীয় সংসদের মন্ত্রিসভায় নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ৬ শতাংশ। ৩০০ আসনের বিপরীতে সাধারণ ভোটে নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যের হার মাত্র ২.৩৬ শতাংশ। যেখানে দ্বাদশ সংসদে মন্ত্রিসভায় ২ জন মন্ত্রী ও ৬ জন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন, সেখানে এবার জায়গা পেয়েছেন মাত্র ৩ জন।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের সভাপতি মিঃ তারেক রহমানের নেতৃত্বে ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে। নতুন মন্ত্রী সভায় স্থান পেয়েছন বিএনপি’র আফরোজা খানম রিতা, (বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী), শামা ওবায়েদ (পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী) এবং ফারজানা শারমিন পুতুল (মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী)।

এবারের নির্বাচনে ৩০০ আসনে ৮৯ জন নারী প্রার্থীর মধ্যে জয়ী হয়েছেন মাত্র ৭ জন। রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন তালিকায় নারীর সংখ্যা কমে যাওয়াই এই বিপর্যয়ের মূল কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নির্বাচিতদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির ৬ জন (আফরোজা খানম, ফারজানা শারমিন, শামা ওবায়েদ, নায়াব ইউসুফ, ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো, তাহসীনা রুশদীর লুনা) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা।

জানতে চাইলে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান এবং ‘নারীপক্ষ’র সদস্য শিরীন পারভিন হক সংবাদ সংস্থা প্রেসেঞ্জা’র এই প্রতিনিধিকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘২৪-এর আন্দোলনে নারীদের অগ্রণী ভূমিকা থাকার পরও যখন তাদের অদৃশ্যমান করা হলো, তখনই প্রমাণিত হয়েছে আমরা তিন ধাপ এগিয়ে চার ধাপ পিছিয়েছি। রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এক ধরনের নারীবিদ্বেষের প্রতিফলন আমরা দেখছি।’

তিনি বলেন, নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠনের পর দেখেছি, নারীরা সম্মুখভাগে, গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়, দেশ, আইন, সংবিধান নিয়ে সিদ্ধান্ত নিবে- সেটা সমাজ সংসার দেখতে চায়না। তাই জনপ্রতিনিধি হবার ক্ষেত্রে নারীদের অনেক বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়।

তিনি আরও বলেন, নারী সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে জাতীয় ঐক্যমত কমিশন’কে ভিন্নধর্মী প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে যে নির্বাচনী এলাকার সীমারেখা রয়েছে সেটা বিবেচনায় রেখে কিভাবে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো যায়- সেই ব্যাপারে।
নারী প্রার্থীর সংখ্যা এবং সাধারণ আসনে কিভাবে নারীরা নির্বাচনে অংশ নিবে, রাজনৈতিক দল দ্বারা মনোনয়ন নয়, সরাসরি ভোটার দ্বারা নির্বাচিত হয়ে আসবেন। এজন্য জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের পাশাপাশি আরো ৩০০ সংরক্ষিত নারী আসনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ সংসদ হবে ৬০০ আসনের। দুটি ব্যালট পেপারে একই নির্বাচনী এলাকায় সাধারণ আসনের জন্য একটি এবং আরেকটি সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য। এই আসনে নারীরাই নারীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে নারী প্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন। তবে জাতীয় ঐক্যমত কমিশন তা আমলে নেয়নি। এমনকি নারী ইস্যু নিয়ে আলোচনার জন্য তাদের সময় পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।

জেন্ডার ও গভর্নেন্স বিশ্লেষক লিপিকা বিশ্বাস মনে করেন, আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকা এবং দলীয় অভ্যন্তরীণ সমীকরণই নারীর পথ রুদ্ধ করছে। তার মতে:

* রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নির্দিষ্ট শতাংশ নারী মনোনয়ন বাধ্যতামূলক করার কোনো আইন নেই।
* প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে দলগুলো কেবল ‘বিজয় নিশ্চিত’ করতে অর্থ ও পেশিশক্তিকে প্রাধান্য দিচ্ছে, যেখানে নারীরা পিছিয়ে পড়ছেন।
* সংসদ সদস্যরা বর্তমানে আইন প্রণয়নের চেয়ে এলাকার উন্নয়ন ও সম্পদ বণ্টনে বেশি মনোযোগী, যা নারীর জন্য রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে।

তবে, এতো সব সীমাবদ্ধতার মাঝেও আশাবাদী নবনির্বাচিত নারী প্রতিনিধিরা। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা জানান, তিনি সংসদে নারী আসন বাড়াতে সচেষ্ট থাকবেন। অন্যদিকে, স্বতন্ত্র থেকে বিজয়ী রুমিন ফারহানা বলেন, ‘দল থেকে নমিনেশন না পেয়ে দলের জোয়ারের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে আমার লড়াই করাটা অনেক কঠিন ছিল। আমি অবহেলিত ও প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে যাবো।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে নারীর প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার এবং মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় জেন্ডার সমতা আনা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, ২০৩০ সালের সমতার লক্ষ্যমাত্রা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।