বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান নগণ্য হলেও, প্রকৃতির চরম প্রতিশোধের মুখে দাঁড়িয়ে আজ এই দেশটিই বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের একটি। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর বিশাল বদ্বীপ অঞ্চলে অবস্থিত বাংলাদেশ এখন বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের এক ‘গ্রাউন্ড জিরো’। পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের এক অসম বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে এই জনপদ।

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সমুদ্রের গর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। এটি কেবল মানচিত্র পরিবর্তনের বিষয় নয়; এর অর্থ হলো লাখ লাখ মানুষের চিরতরে বাস্তুচ্যুত হওয়া। এটি বিশ্বের বৃহত্তম মানবিক সংকটের একটিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা জাগিয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিডর, আইলা, আম্পান এবং মোখার মতো বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়গুলো বারবার আঘাত হেনেছে। প্রতিটি দুর্যোগ কেবল ঘরবাড়িই ভাঙছে না, বরং ভেঙে দিচ্ছে প্রান্তিক মানুষের মেরুদণ্ড। বর্ষা মৌসুমে বন্যার তীব্রতা এখন এতটাই বেড়েছে যে, তা প্রতি বছর কোটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে তছনছ করে দিচ্ছে এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে।

উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রের নোনা পানি মিষ্টি পানির উৎসে মিশে যাচ্ছে। ফলে জমিতে ফসল ফলানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে এবং সুপেয় পানির সংকট জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করছে। জীবন বাঁচাতে ভিটেমাটি ছেড়ে মানুষ ছুটছে রাজধানী ঢাকার মতো জনাকীর্ণ শহরগুলোর দিকে। নদীভাঙন ও নোনা পানির কারণে ভিটেমাটি হারানো এই ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’দের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, যা নগর সম্পদের ওপর সৃষ্টি করছে নজিরবিহীন চাপ।

গবেষণা বলছে, জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশ প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। কৃষি ও মৎস্য খাতের এই ক্ষতি জাতীয় দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করছে। পাশাপাশি তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ডেঙ্গু ও কলেরার মতো রোগের প্রাদুর্ভাব এবং খাদ্য সংকটের কারণে অপুষ্টির হার বাড়ছে, যা একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে সংকটাপন্ন করে তুলছে।

এত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ হাল ছাড়েনি। অভিযোজন বা খাপ খাইয়ে নেওয়ার লড়াইয়ে দেশটি আজ বিশ্বের কাছে রোল মডেল। সরকারের নির্মিত সাইক্লোন শেল্টার, উপকূলীয় বাঁধ এবং বিশ্বের অন্যতম সেরা আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষা করছে। স্থানীয় পর্যায়ে লবণাক্ততা-সহিষ্ণু ফসল চাষের মতো উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলোও আশার আলো দেখাচ্ছে।

তবে বাংলাদেশের এই একাকী লড়াই যথেষ্ট নয়। প্রেসেনজার মানবিক দর্শনের আলোকে বিশেষজ্ঞরা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, এটি একটি ‘জলবায়ু অন্যায়’। উন্নত দেশগুলোর অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের দায়ভার বইছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। তাই কেবল সহানুভূতি নয়, বরং জোরালো আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, প্রতিশ্রুত জলবায়ু অর্থায়ন এবং উন্নত প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে উন্নত দেশগুলোকে এই সংকট মোকাবিলায় দায়বদ্ধ হতে হবে।

বাংলাদেশ আজ জলবায়ু সংকটের এক জ্বলন্ত বিজ্ঞাপন। দেশটির স্থিতিশীলতা কেবল দক্ষিণ এশিয়ার জন্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে পরিবেশগত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি বড় পরীক্ষা। এখনই কার্যকর বৈশ্বিক পদক্ষেপ নেওয়া না হলে, আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশ যে নজিরবিহীন ঝুঁকির মুখে পড়বে, তার আঁচ থেকে মুক্ত থাকবে না বিশ্বও।