বোরহান উদ্দিন (ঢাকা ব্যুরো)

দীর্ঘ দেড় দশকের রাজপথের লড়াই, মামলা-হামলা আর ত্যাগের অধ্যায় পেরিয়ে দেশের আইনসভায় জায়গা করে নিলেন সাবেক ছাত্রদল নেতাদের এক বিশাল বহর।

এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩১ জন সাবেক ছাত্রনেতা বিজয়ী হয়ে আইনপ্রণেতা হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই প্রথমবারের মতো সংসদে পা রাখছেন, যা দেশের সংসদীয় রাজনীতিতে এক নতুন গতির সঞ্চার করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

শুধু ক্ষমতাসীন বিএনপি নয়, বিরোধী দলে থাকা জামায়াতে ইসলামী ও তরুণদের গড়া দল এনসিপি থেকে এবার নতুন মুখ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে এবারের নতুন সংসদ তরুণদের বড় অংশের পদচারণায় মুখর হবে- এমন প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে এই সাবেক ছাত্রনেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের আইনপ্রণেতা হিসেবে যাত্রা শুরু করেছেন।

দখলে সংসদ ও মন্ত্রিসভা

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করেছে। দলটির নতুন সভাপতি এবং নেতাকর্মীদের কাছে তারুণ্যের প্রতীক হিসেবে আখ্যা পাওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবারই প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বিজয়ী দলের সংসদীয় কমিটির স ভায় তাকেই সংসদ নেতা নির্বাচিত করা হয়েছে। ফলে প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়লাভ করার পর তারেক রহমান একাধারে এমপি, সংসদ নেতা, মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন।

তারেক রহমান এবার রাষ্ট্র পরিচালনায় তারুণ্যকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এবারের সংসদে শুধুমাত্র বিএনপিরই প্রায় ৩১ জন সাবেক ছাত্রনেতা সংসদ সদস্য হিসেবে সরাসরি নির্বাচিত হয়েছেন। এদের মধ্যে অনেকেই বিগত ১৭ বছর রাজপথে জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। নতুন মন্ত্রিসভায়- সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, শামা ওবায়েদ, ববি হাজ্জাজ, জুনায়েদ সাকি, নূরুল হক নূর এবং প্রকৌশলী ইশরাক হোসেনের মতো তরুণদের বড় অংশকে জায়গা দেয়া হয়েছে।

ছাত্রদলের সাবেক যেসব অভিজ্ঞ মুখ যাচ্ছে সংসদে

ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে এবার ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে এসে যারা আগেও সংসদ সদস্য ছিলেন এবং এবারও নিজ নিজ আসনে বিজয়ী হয়েছেন তারা হলেন- ঢাকার আমান উল্লাহ আমান, নরসিংদীর খায়রুল কবির খোকন, গাজীপুরে এ কে এম ফজলুল হক মিলন, নোয়াখালীতে ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, নাটোরে রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, চাঁদপুরের এহছানুল হক মিলন, লক্ষ্মীপুরে শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, খাগড়াছড়ির আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া।

প্রথমবার সংসদে যাচ্ছেন যারা

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চমক হচ্ছে একঝাঁক সাবেক ছাত্রনেতার প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হওয়া রাজপথের ‘লড়াকু সৈনিক’ থেকে তারা এখন ‘আইনপ্রণেতা’। এই তালিকায় আছেন: ঢাকা বিভাগের মধ্যে ঢাকার আসনগুলো থেকে খন্দকার আবু আশফাক, হামিদুর রহমান হামিদ, হাবিবুর রশিদ হাবিব, এস এম জাহাঙ্গীর, মাদারীপুরে আনিসুর রহমান খোকন, টাঙ্গাইলে সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, মুন্সিগঞ্জে কামরুজ্জামান রতন, ফরিদপুরে শহীদুল ইসলাম বাবুল, শরীয়তপুরে নুরুদ্দিন আহমেদ অপু প্রথমবার নির্বাচিত হয়েছেন।

বরিশাল ও খুলনা বিভাগে ভোলার নুরুল ইসলাম নয়ন, পটুয়াখালীর এ বি এম মোশাররফ হোসেন, বরিশালে রাজিব আহসান, খুলনায় রকিবুল ইসলাম বকুল ও আজিজুল বারী হেলাল নির্বাচিত হয়েছেন।

এছাড়াও গোপালগঞ্জে এস এম জিলানী, সেলিমুজ্জামান মোল্যা, সিরাজগঞ্জে আমিরুল ইসলাম খান আলীম, নেত্রকোনায় ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, ময়মনসিংহের মাহবুবুর রহমান লিটন, সুনামগঞ্জে অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল, ফেনীর রফিকুল আলম মজনু, লক্ষ্মীপুরে শাহাদাত হোসেন সেলিম, পঞ্চগড় থেকে ফরহাদ হোসেন আজাদ প্রথমবার নির্বাচিত হয়েছেন।

সংসদে এনসিপি ও জামায়াতের তরুণ তুর্কিরা

এদিকে শুধুমাত্র সরকারি দল নয়, বিরোধী শিবিরেও এবার তারুণ্যের জয়জয়কার। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) এবং জামায়াতে ইসলামী থেকে একঝাঁক তরুণ নেতা সংসদে যাচ্ছেন।
জুলাই বিপ্লবের সম্মুখসারির নেতারা এবার সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদে জেন-জি প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করবেন। তাদের মধ্যে নাহিদ ইসলাম, হাসতান আব্দুল্লাহ, আবদুল হান্নান মাসউদ, আখতার হোসেন, আব্দুল্লাহ আল আমিন, আতিকুর রহমান মোজাহিদদের মতো তরুণরা সংসদে যোগ দিচ্ছেন।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর এবারের সংসদ সদস্যদের মধ্যে ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদসহ একঝাঁক তরুণ ও নতুন মুখ রয়েছে। এদের বেশিরভাগ উচ্চশিক্ষিত ও সাবেক ছাত্রনেতা।

সংরক্ষিত আসনেও তারুণ্যের হাতছানি

সরাসরি নির্বাচিত ৩০০ আসনেই নয়, সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনেও এবার তরুণীদের প্রাধান্য দেওয়ার আভাস দিয়েছে বিএনপি। বর্তমান আসন বণ্টন অনুযায়ী, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বিএনপি ৫০টির মধ্যে একাই পেতে পারে ৩৫ থেকে ৩৬টি আসন। এই আসনগুলোতে সাবেক সংসদ সদস্যদের বাইরে সাবেক ছাত্রনেতাদের মধ্য থেকে বড় একটি মনোনয়ন পেতে পারে বলে দলের পক্ষ থেকে আভাস দেয়া হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির আগের আমলের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সাথে এবার এক ঝাঁক ছাত্রনেতা থাকায় তারেক রহমানের সরকার পরিচালনা অনেকটা সহজ হবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় বড় ভূমিকা রাখতে পারবেন তরুণ সংসদ সদস্যরা।

নেতাকর্মীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস

সাবেক ছাত্রনেতাদের এই বিশাল বিজয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে নয়, বরং জনগণের ‘সেবক’ হিসেবে কাজ করতে চান। বিশেষ করে ঢাকা-৯ থেকে নির্বাচিত হাবিবুর রশিদ হাবিব ও ভোলা-৪ থেকে নির্বাচিত নুরুল ইসলাম নয়ন জানান, রাজপথের লড়াই শেষে এখন সাধারণ মানুষের আমানত রক্ষা করাই তাদের মূল লক্ষ্য।

সংসদীয় রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের সুযোগ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজপথ কাঁপানো এই ছাত্রনেতাদের সংসদে উপস্থিতি কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক বিজয় নয়, বরং এটি সংসদীয় বিতর্কে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে যারা জেল-জুলুম ও দমন-পীড়ন সহ্য করে মাঠের রাজনীতিতে টিকে ছিলেন, তারা সাধারণ মানুষের সংকট ও আকাঙ্ক্ষাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। ফলে সংসদে জনগুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন এবং নীতি নির্ধারণী আলোচনায় এই তরুণ ও অভিজ্ঞ নেতাদের অংশগ্রহণ সংসদকে আরও প্রাণবন্ত ও কার্যকর করে তুলবে।


বোরহান উদ্দিনঃ প্রধান প্রতিবেদক, ঢাকা মেইল। কন্ট্রিবিউটর, প্রেসেঞ্জা- ঢাকা ব্যুরো।