মাসুম পারভেজ কল্লোল (ঢাকা ব্যুরো)
একুশ শতকের দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব ব্যবস্থায় প্রযুক্তি ও অর্থনীতির অভূতপূর্ব উল্লম্ফন ঘটলেও নেতৃত্বের নৈতিক মানদণ্ড নিয়ে এক গভীর আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে ফাঁস হওয়া নথি এবং প্রভাবশালী নেটওয়ার্কগুলোর বিতর্কিত কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে যে, নেতৃত্বের সংকট কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং এটি একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক সংকট। বৈশ্বিক নেতৃত্বের মনস্তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্ক (The Psychological Spectrum) বা নেতৃত্বের ধরনকে তিনটি প্রধান স্তরে ভাগ করলে দেখা যায়-
এক. মানবিক ও সেবাধর্মী নেতৃত্ব: এখানে ক্ষমতাকে দেখা হয় একটি ‘পবিত্র আমানত’ হিসেবে। শাসনের চেয়ে ‘সেবা’ এখানে মুখ্য, যা সমাজে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।
দুই. কৌশলগত ও স্বার্থচালিত নেতৃত্ব: এটি বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে প্রচলিত ধারা। এখানে আদর্শের চেয়ে ‘রিস্ক অ্যানালাইসিস’ বা ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং জাতীয় বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ বড় হয়ে দাঁড়ায়।
তিন. অহং-চালিত (Ego-driven) নেতৃত্ব: এটি সভ্যতার জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে ক্ষমতা নিজেই লক্ষ্য এবং সমালোচনাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা হুমকি হিসেবে দেখা হয়। ইতিহাসের বড় বড় মানবিক বিপর্যয়ের মূলে রয়েছে এই বিশেষ মনস্তত্ত্ব।
অথচ সভ্যতা মানেই হলো ‘জোর যার মুলুক তার’—এই আদিম প্রবৃত্তি থেকে আইন ও মানবাধিকারের শাসনে উত্তরণ। কিন্তু যখন বৈশ্বিক নীতিনির্ধারকরা জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন, তখন ডারউইনের ‘যোগ্যতমের টিকে থাকা’ তত্ত্বটি ভুল পথে পরিচালিত হয়। ডারউইনের বিবর্তনবাদকে আধুনিক সমাজ ‘ন্যায়পরায়ণতা ও সহযোগিতার’ মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করতে চেয়েছিল। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব যখন জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে চলে যায়, তখন প্রশ্ন ওঠে- আমরা কি মনস্তাত্ত্বিকভাবে একটি আদিম যুগের দিকে ধাবিত হচ্ছি? যেখানে বিবেকের চেয়ে পেশিশক্তিই বড় সত্য।
আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি অর্থনৈতিক মন্দা বা প্রযুক্তিগত বিভেদ নয়; বরং এটি হলো ‘নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট’। যখন সাধারণ মানুষ প্রচলিত ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারায়, তখন সমাজে মেরুকরণ বৃদ্ধি পায় এবং চরমপন্থা মাথাচাড়া দেয়। এই ভাঙন কেবল কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি দিয়ে মেরামত করা সম্ভব নয়।
আমরা জানি- নেতৃত্বের বীজ রোপিত হয় তৃণমূল পর্যায়ে। শ্রেণিকক্ষ, খেলার মাঠ কিংবা স্থানীয় কমিউনিটি থেকেই ভবিষ্যতের নেতৃত্বের ডিএনএ (DNA) নির্ধারিত হয়। অর্থাৎ ‘যদি মানবতা নৈতিক বৈশ্বিক নেতৃত্ব চায়, তবে তাকে আগে নৈতিক স্থানীয় নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে। ’
সভ্যতার ভবিষ্যৎ কেবল বড় বড় হোটেলের কনফারেন্স রুমে লেখা হবে না, বরং তা নির্ধারিত হবে প্রতিটি নাগরিক এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতিদিনের সিদ্ধান্তে। যখন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সাময়িক সুবিধার চেয়ে স্বচ্ছতাকে এবং নিয়ন্ত্রণের চেয়ে জবাবদিহিতাকে বেছে নেয়, তখনই সভ্যতা এক ধাপ এগিয়ে যায়।
বর্তমান বিশ্বের দাবি হলো- ক্ষমতার সাথে নৈতিকতার একটি ভারসাম্যপূর্ণ সংশ্লেষণ। ক্ষমতা যখন সেবার হাতিয়ার না হয়ে কেবল আধিপত্যের মাধ্যম হয়, তখন সভ্যতার সূক্ষ্ম সীমারেখা বিলীন হতে শুরু করে। বর্তমান বিশ্বকে যদি একটি আধুনিক ও মানবিক ভবিষ্যৎ গড়ার পথে থাকতে হয়, তবে ক্ষমতার সাথে নৈতিকতার এই ভারসাম্য রক্ষা করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। আমাদের সম্মিলিত বিবেকই হতে পারে এই অন্ধকার সময়ের আলোকবর্তিকা। আর এই সম্মিলিত বিবেক জাগ্রত হতে পারে- সর্বাবস্থায় নন-ভায়োলেন্স এটিচ্যুয়েডের মাধ্যমে।
মাসুম পারভেজ কল্লোলঃ মানবিক ও যুব উন্নয়ন কর্মী এবং কন্ট্রিবিউটর, প্রেসেঞ্জা- ঢাকা ব্যুরো।

