উৎসবমুখর পরিবেশে দেশব্যাপী আজ বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে জাতি। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের পতনের পর প্রথম গণতান্ত্রিক অনুশীলনে অংশ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আজ বৃহস্পতিবার প্রায় ১৩ কোটি ভোটার একটি যুগান্তকারী সাধারণ নির্বাচন এবং একই সঙ্গে একটি জাতীয় গণভোটে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন।
১২ ফেব্রুয়ারির এই ‘দ্বৈত-ভোট’কে বৈশ্বিক বিশ্লেষকরা দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটির জন্য একটি ’গণতান্ত্রিক পুনঃসূচনা’ (Democratic Reset) হিসেবে দেখছেন। ভোটাররা একই সাথে সংসদের ৩০০টি আসনের প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর ওপর রায় দেবেন- যা মূলত স্বৈরতন্ত্রের পুনরাবৃত্তি রোধে প্রস্তাবিত ব্যাপক সাংবিধানিক সংস্কারের একটি রূপরেখা।
গত মঙ্গলবার ভোরে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচার শেষ হওয়ার পর দেশজুড়ে এক উৎসবমুখর অথচ টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। রাজধানী ঢাকা ছেড়ে লাখ লাখ মানুষ ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় নিজ নিজ গ্রামে ফিরেছেন। বাস, ট্রেন ও লঞ্চে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে একজন তরুণ ভোটার বলেন, ‘এটি কেবল একটি নির্বাচন নয়; এটি আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ। ‘ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্যমতে, দেশে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২৩৪ জন। মোট ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবারের নির্বাচনে।
একটি ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক’ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রায় ১০ লাখ নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করেছে, যার মধ্যে ১ লাখ সেনাসদস্যও রয়েছেন। ভোটের প্রাক্কালে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন- ‘ব্যালট ছিনতাই, জাল ভোট বা যেকোনো অনিয়মের সাথে জড়িত কর্মকর্তা বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ‘

শান্তিপূর্ণ ভোট নিশ্চিত করার জন্য, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সেনাবাহিনী সারা দেশে টহল জোরদার করেছে। ছবি – সংগৃহীত।
নির্বাচন কেন্দ্রিক পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এখন আন্তর্জাতিক মহলের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণে রয়েছে। কমনওয়েলথ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এনজিওর ৩৯৪ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং ১৯৭ জন বিদেশি সাংবাদিক বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন জোর দিয়ে বলেছেন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদনেই নির্বাচনের প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠবে।
পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জামায়াতে ইসলামী তাদের নিজ নিজ জোট নিয়ে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে রয়েছে ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্বকারী নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং জাতীয় পার্টি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিবন্ধন স্থগিত থাকায় এবারের ব্যালটে আওয়ামী লীগের কোনো উপস্থিতি থাকছে না।
গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক প্রেস এজেন্সি- প্রেসেঞ্জা’র সংগে আলাপকালে বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমান নির্বাচনী পরিবেশ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, কোনো একক দলের ল্যান্ডস্লাইড বিজয়ের সুযোগ খুব কম। একটি মুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ সব প্রার্থীকে তাদের পরিকল্পনা ও প্রস্তাব নিয়ে ভোটারদের কাছে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। ’
অন্য এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এস এম আলী রেজা জানান, বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী প্রায় ৩০ শতাংশ ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীন। তিনি বলেন, ‘এই ভাসমান বা দোদুল্যমান ভোটাররা চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবেন। ‘ তিনি আরও পর্যবেক্ষণ করেন যে, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে অনেক নাগরিক সংসদে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতি পছন্দ করতে পারেন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত কয়েক সপ্তাহে রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে।

এই ব্যালট বাক্সে ভোটাররা তাদের গোপন ভোটটি (ব্যালট পেপার) ফেলে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
ছবিঃ বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের সৌজন্যে।
নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের উচ্চাশা থাকলেও নির্বাচনের আগের সময়টা একেবারে নিষ্কণ্টক ছিল না। ভোটের আগের দিন সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের এক নেতাকে নগদ ৭৪ লাখ টাকাসহ আটক করেছে পুলিশ, যা ভোট কেনার চেষ্টার অভিযোগ তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও কিছু জায়গায় ভীতি প্রদর্শনের খবর ছড়িয়েছে, যদিও ইসি সেগুলোকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে আর্ন্তবর্তীকালিন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নাগরিকদের ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে ‘বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ’কে প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানান। ড. ইউনূস বলেন- ‘বিজয় যেমন গণতন্ত্রের অংশ, পরাজয়ও এর অবিচ্ছেদ্য সত্য। ফলাফল যাই হোক না কেন, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা যেন আমাদের সম্মিলিত ভাগ্য নির্ধারণে পথপ্রদর্শক হয়।”
আজ বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ৪২,৭৭৯টি কেন্দ্রে একযোগে ভোটগ্রহণ শুরু হবে। সংসদীয় আসন এবং গণভোট- উভয় ফলের প্রাথমিক আভাস আজ গভীর রাত থেকেই পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

