আসিফ শওকত কল্লোল (ঢাকা ব্যুরো)
বিশ্বজুড়ে আলোচিত পানামা পেপারসে নাম আসা একটি কোম্পানির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ থেকে বড় ধরনের অর্থপাচারের অভিযোগ উঠেছে। তদন্তকারীরা দাবি করছেন, দেশের বৃহত্তম মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশের একজন ডিস্ট্রিবিউটরের মাধ্যমে প্রায় ২২০ বিলিয়ন টাকা (১.৬ বিলিয়ন পাউন্ড) বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে বিকাশের ডিস্ট্রিবিউটর ‘জেন ইন্টারন্যাশনাল’ (Gen International)। এই প্রতিষ্ঠানের মূল বা সহযোগী সংস্থা ‘জেটলাইট ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড’ (Jetlight Investment Limited)-এর নাম পানামা পেপারসের নথিতে পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বর্তমানে অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছে। অভিযোগ রয়েছে, জেন ইন্টারন্যাশনাল প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করে বিপুল পরিমাণ সন্দেহজনক লেনদেন করেছে।
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, যেকোনো বিদেশি মালিকানাধীন বা যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানিকে ব্যবসা শুরুর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা/BIDA)-এর অনুমোদন নিতে হয়। তদন্তকারীরা বলছেন, জেন ইন্টারন্যাশনাল এর কোনোটিই করেনি। পরিবর্তে, প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের একটি ট্রেড লাইসেন্স ব্যবহার করে কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল, যা প্রকৃত বিদেশি মালিকদের পরিবর্তে কর্মচারীদের নামে নিবন্ধিত ছিল।
নিয়মবহির্ভূত এই কার্যক্রম সত্ত্বেও কোম্পানিটি বিকাশের ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ চালিয়ে গেছে, যা কর্পোরেট তদারকি এবং কমপ্লায়েন্স নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) বিকাশ-সংশ্লিষ্ট চ্যানেলের মাধ্যমে প্রায় ২২০ বিলিয়ন টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের প্রমাণ পেয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বিএফআইইউ বিষয়টি সিআইডিকে ফৌজদারি তদন্তের জন্য হস্তান্তর করেছে। তদন্তের সাথে জড়িত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদ সংস্থা প্রেসেঞ্জা’কে জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঠানো অভিযোগগুলো ‘সম্পূর্ণ প্রমাণিত’ হয়েছে। তারা আরও জানান, তদন্তে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে যা এখনই প্রকাশ করা যাচ্ছে না। বর্তমানে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান নিশ্চিত করেছেন যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান আইনত লভ্যাংশ বিদেশে পাঠাতে পারে না। তিনি বলেন, ‘জেন ইন্টারন্যাশনাল যদি অনুমোদন ছাড়া কাজ করে থাকে, তবে যেকোনো মুনাফা পাচার অবশ্যই অবৈধ চ্যানেলে হয়েছে।’
জেন ইন্টারন্যাশনালের মালিকানা কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিএফআইইউ-এর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এর শেয়ারের একটি বড় অংশ ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে নিবন্ধিত ‘জেটলাইট ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড’-এর হাতে। ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস অফশোর গোপনীয়তার জন্য পরিচিত। ওপেন-সোর্স তথ্য অনুযায়ী, ১০০টিরও বেশি কোম্পানি একই নিবন্ধিত ঠিকানা ব্যবহার করছে। ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অফ ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (ICIJ) এই ঠিকানাকে পানামা পেপারসে উল্লেখিত সত্তাগুলোর সাথে যুক্ত করেছে, যার ফলে তদন্তকারীরা জেটলাইটকে একটি ‘শেল কোম্পানি’ (নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান) হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে।
তদন্তে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া জুড়ে বিস্তৃত একটি হুন্ডি চক্রের সাথেও এর যোগসূত্র পাওয়া গেছে। মালয়েশিয়ার আর্থিক কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেন ইন্টারন্যাশনালের প্রকৃত মালিকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ জমা হয়েছে। এই লেনদেন গুলোকে প্রায়ই বাংলাদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে পাওয়া ‘উপহার’ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা অবৈধ রেমিট্যান্স বা হুন্ডি ব্যবসার একটি পরিচিত কৌশল।
যোগাযোগ করা হলে বিকাশের হেড অব কমিউনিকেশনস শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম জানান, ডিস্ট্রিবিউটরশিপ চুক্তির আগে বিকাশ জেন ইন্টারন্যাশনালের আইনি কাগজপত্র যাচাই করেছিল। তিনি আরও বলেন, ডিস্ট্রিবিউটর কীভাবে তাদের মুনাফা স্থানান্তর করে তা ‘বিকাশের দায়িত্ব নয়’। বিএফআইইউ রিপোর্টে উল্লিখিত অসঙ্গতিগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি তদন্তাধীন বিষয় বলে মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, বিডা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা করা- বিশেষ করে যেখানে মুনাফা বিদেশে পাঠানো হয়- তা বাংলাদেশের ‘মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২’ অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
তদন্ত যত এগুচ্ছে, এই মামলাটি দেশের দ্রুত বর্ধনশীল ডিজিটাল ফিন্যান্স খাতের দুর্বলতা, কর্পোরেট জবাবদিহিতা এবং নিয়ন্ত্রণমূলক তদারকি নিয়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করছে।


