বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তাপ এখন তুঙ্গে। বড় দলগুলো ইতোমধ্যে তাদের নির্বাচনী ইশতিহারে সংস্কার, সুশাসন এবং জনকল্যাণমূলক নানা চমকপ্রদ প্রতিশ্রুতি নিয়ে হাজির হয়েছে। দেশের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নির্বাচনী ইশতিহারে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ (দেশ আগে) নীতি এবং ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতিকে সামনে রেখেছে। এরমধ্যে রয়েছে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে মাসে ২,৫০০ টাকা ভাতা বা সমমূল্যের খাদ্যসামগ্রী দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা। মেয়েদের জন্য স্নাতকোত্তর (Masters) পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করা। মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং স্কুলগুলোতে ফ্রি ওয়াই-ফাই প্রদান। স্বাস্থ্যসেবা খাতে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং জেলা পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। দুর্নীতিতে ‘জিরো টলারেন্স’, গত ১৬ বছরের দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের নামে রাষ্ট্রীয় স্থাপনার নামকরণ। কারও সঙ্গে প্রভুত্ব নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব- বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং তিস্তা পানিবন্টন চুক্তিতে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।

দেশের অন্যতম বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনী ইশতিহারে ২৬টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছে, যার মূল ভিত্তি হলো ইনসাফ ও নৈতিকতা। এরমধ্যে রয়েছে- নির্বাচনী সংস্কারে ক্ষেত্রে তারা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (PR) ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে। নারীদের জন্য কর্মঘণ্টা কমানো এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করবে। তরুণদের প্রশাসনে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় নিয়ে আসবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ ছাড়া বিচার ও মানবাধিকার নিয়ে তারা বিগত দিনের গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং জুলাই বিপ্লবের গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার কথা বলেছে। অর্থনীতিতে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ভেজালমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করাসহ পররাষ্ট্র নীতিতে মুসলিম বিশ্বের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ার অঙ্গিকার করেছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চেতনায় গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৩৬ দফা ইশতিহার ঘোষণা করেছে। এর অন্যতম হচ্ছে: সংবিধানে ‘জুলাই সনদ’-এর অন্তর্ভুক্তি এবং বিপ্লবের চেতনা বাস্তবায়ন। ঋণখেলাপিদের শাস্তি দেয়া, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়া এবং সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা। পরিবেশ ও উন্নয়নে নতুন এই দলটি শিল্পকারখানায় ইটিপি বাধ্যতামূলক করা এবং তিস্তা মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি চালু করার ক্ষেত্রে এনসিপি ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির বদলে জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা চালুর অঙ্গিকার করেছে।

দেশের ধর্ম ভিত্তিক রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং সমমনা ইসলামী দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতিহারে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের ওপর জোর দিয়েছে। এই জোট নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করলে দেশে কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক আইনের শাসন কায়েম এবং পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর পরিপন্থী কোনো আইন পাস না করার অঙ্গীকার করেছে। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে তারা সুদ ও ঘুষমুক্ত অর্থনীতি এবং ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা কায়েমের মাধ্যমে সামাজিক বৈষম্য দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া কওমি মাদরাসার সনদের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি এবং সাধারণ শিক্ষায় ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার অঙ্গিকার করেছে।

উল্লেখ্য, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে জিডিপি কেন্দ্রিক উন্নয়নের চেয়ে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও দুর্নীতির মূলোৎপাটনকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। বিএনপি বিনিয়োগ-চালিত অর্থনীতির ক্ষেত্রে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য ঘোষনা করেছে। লুটেরা অর্থনীতির বদলে উৎপাদনমুখী অর্থনীতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (FDI) জিডিপির ২.৫%-এ উন্নীত করা এবং ‘স্মার্ট কানেক্টিভিটি’র মাধ্যমে বাংলাদেশকে আইসিটি হাব বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

জামায়াতে ইসলামী ইনসাফ ভিত্তিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে আমূল সংস্কারের কথা জোর দিয়ে বলেছে। এরমধ্যে কৃষি বিপ্লবের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) বিকাশের মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করা এবং নারীদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ সৃষ্টির কথা রয়েছে।

ইশতেহারে এনসিপি মানবিক উন্নয়ন মডেলে শুধুমাত্র জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে উন্নয়নের মাপকাঠি না মেনে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতাকে গুরুত্ব দিয়েছে। ঋণখেলাপিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং ঘণ্টা প্রতি ১০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকায় প্রতিটি দলই পরিবেশ নিয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা বলেছে।

বিএনপি’র ‘সবুজ বাংলাদেশ’ পরিকল্পনায় খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ অভিযানকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। তারা ৫ বছরে সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন এবং ২৫ কোটি গাছ লাগানোর বিশাল লক্ষ্যমাত্রার কথা ঘোষনা করেছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে বর্জ্য রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে দূষণমুক্ত নগর গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

পরিবেশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামী ‘থ্রি জিরো’ ভিশন ঘোষনা করেছে। থ্রি জিরো’র (3 Zero) মধ্যে রয়েছে- শূন্য পরিবেশ অবক্ষয়, শূন্য বর্জ্য এবং শূন্য বন্যা ঝুঁকি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া শিল্পায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

পরিবেশ ও প্রতিবেশ উন্নয়নে এনসিপি ও নাগরিক ভাবনা’র নির্বাচনী ইশতিহারে রয়েছে তিস্তা নদী নিয়ে মাস্টার প্ল্যান। তিস্তা নদী রক্ষা ও পানিবন্টন সমস্যার স্থায়ী সমাধানে ‘তিস্তা মাস্টার প্ল্যান’ বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনে পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া পরিবেশ রক্ষায় শিল্প-কারখানায় ইটিপি (Effluent Treatment Plant) ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

মাঠ পর্যায়ে সাধারণ ভোটারদের মনের অবস্থা এবং ইশতিহার নিয়ে তাদের আস্থা ও প্রত্যাশার বিষয়টি বোঝার জন্য প্রেসেঞ্জা- ঢাকা ব্যুরোর প্রতিনিধির সাথে কথা হয় ঢাকার মিরপুর নিবাসী ভোটার জনাব আব্দুল খালেক ভূঁইয়ার সাথে। জনাব ভূইয়া একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা। আলোচনার শুরুতে তিনি আক্ষেপের সুরে জানান- ‘এই নির্বাচনে দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে ভোটের বাইরে রাখাটা কোন ভাবেই যুক্তিযুক্ত হয়নি। এই নির্বাচনকে তাই আমি পার্টিসিপেটরী বা ইনক্লুসিভ নির্বাচন বলতে পারছি না। নির্বাচন যদি হয়েও যায়, তখন এই নির্বাচনে বিজয়ী দল নির্দ্দিষ্ট মেয়াদে শান্তিপূর্ণভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে কি না- সে ব্যাপারে যথেষ্ট সংশয়-সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। ’ মিস্টার খালেক ভূঁইয়ার কাছে জানতে চাওয়া হয়- ‘বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন দেখাচ্ছে, আবার জামায়াত বলছে ইনসাফ ভিত্তিক অর্থনীতির কথা। সাধারণ মানুষ হিসেবে আপনার কি মনে হয় এতে আপনার নিত্যপণ্যের দাম বা জীবনযাত্রার ব্যয় কমবে?’ মিস্টার ভূঁইয়ার সরাসরি জবাব ছিলো- ‘না’। তিনি বলেন- ‘বাংলাদেশে তো অনেক ইশতিহারের ইতিহাস আছে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতিহারের কতটা বাস্তবায়ন করে তা সবার জানা আছে। ৫০ শতাংশও বাস্তবায়ন হয় না। ’

ঢাকার উত্তরার ভোটার মিসেস সাজেদা বেগম (৪০) পেশায় একজন সরকারী কর্মকর্তা। তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিলো- প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে কর্মসংস্থান নিয়ে অনেক বড় বড় কথা বলছে। আপনি কি মনে করেন নির্বাচনের পর বেকার যুবকদের জন্য আসলেই কাজের সুযোগ তৈরি হবে, নাকি এগুলো শুধু ভোটের কথা? এছাড়া ব্যাংকিং খাত বা দুর্নীতি নিয়ে দলগুলোর কঠোর অবস্থানের কথা হয়ত শুনছেন। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় কি আপনি বিশ্বাস করেন তারা আসলেই বড় বড় ঋণখেলাপিদের বিচার করতে পারবে? জবাবে মিসেস সাজেদা বলেন- ‌বাস্তবতার নিরিখে আমি এই দুই প্রতিশ্রুতির একটাও বিশ্বাস করি না। ‘ ‘২৪ এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের সাধারণ মানুষের মনে সুস্থ্য রাজনৈতিক চর্চা বা রাজনৈতিক সংস্কারের যে আশা তৈরী হয়েছিলো, সেই সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় দেশের প্রচলিত রাজনীতির উপর থেকে মানুষের আস্থা তলানীতে গিয়ে ঠেকেছে’- যোগ করেন মিসেস সাজেদা।