রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের দাবি

বাংলাদেশের আসন্ন ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের বিপন্ন হাওর, খাল-বিল ও জলাভূমি রক্ষায় সরকারের প্রতি কঠোর দাবি জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও পরিবেশবিদরা। তারা সতর্ক করে বলেছেন, জলাভূমি রক্ষায় বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়হীনতা দূর করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে দেশ ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) রাজধানীর লালমাটিয়ায় অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট (এএলআরডি) আয়োজিত ‘সংকটে বাংলাদেশের বিল, হাওর ও জলাভূমি: জনগণের অংশগ্রহণে টেকসই সংরক্ষণ’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
জলাভূমির আশঙ্কাজনক চিত্র
সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে জানানো হয়, দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭১ সালের জরিপ অনুযায়ী দেশে ৯৩ লাখ হেক্টর জলাভূমি থাকলেও বর্তমানে তা ৭০ শতাংশ হ্রাস পেয়ে মাত্র ২৮ লাখ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ:
* গত ৩০ বছরে ঢাকার ৮৫ শতাংশ জলাভূমি বিলীন হয়েছে।
* এক সময়কার সমৃদ্ধ ৪৭টি খাল এখন মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে।
* জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, ঢাকার মাত্র ৩ শতাংশ এলাকায় জলাভূমি অবশিষ্ট আছে।
এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। ১৯৯৬ সালে ঢাকার পানির স্তর যেখানে ২৫ মিটারে ছিল, ২০২৪ সালে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ৮৬ মিটারে।
সমন্বয়হীনতা ও আইনি জটিলতা
সেমিনারে বক্তারা ‘হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, আইনি সুযোগ থাকলেও আন্তঃমন্ত্রণালয় কোন্দল ও সমন্বয়ের অভাবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে ভূমি মন্ত্রণালয় এবং হাওর বোর্ডের মধ্যে প্রশাসনিক রশি টানাটানির কারণে হালতি বিল বা হাওর অঞ্চলের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো ‘সংরক্ষিত’ ঘোষণা করা সম্ভব হচ্ছে না।
এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, ‘আমাদের উন্নয়নের সংজ্ঞা বদলাতে হবে। পরিবেশ ধ্বংসকারী উন্নয়নকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিরুৎসাহিত করা জরুরি। আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থীদের ইশতেহারে জলাভূমি রক্ষার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আমরা চাপ সৃষ্টি করছি।’
স্থানীয় সংকট ও দখলের মহোৎসব
সেমিনারে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা প্রতিনিধিরা স্থানীয় সংকটের চিত্র তুলে ধরেন:
চলনবিলঃ তাড়াশ এলাকা থেকে আসা প্রতিনিধিরা জানান, ‘ভূমি অপরাধ প্রতিকার ও প্রতিরোধ আইন ২০২৩’ থাকলেও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অবৈধ পুকুর খনন ও বিল ভরাট থামছে না।
সাভার ও বুড়িগঙ্গাঃ সাভারে অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও ভূগর্ভস্থ পানির অতি-ব্যবহারের ফলে আগামী ২০-২৫ বছরের মধ্যে তীব্র পানি সংকটের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বুড়িগঙ্গার সীমানা নির্ধারণে আইনি মারপ্যাঁচ ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।
হাওর অঞ্চলঃ কিশোরগঞ্জের হাওরে নির্মিত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে অপরিকল্পিত উল্লেখ করে বলা হয়, এটি পরিবেশের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে।
আন্তর্জাতিক পানি রাজনীতি ও দাবি
পরিবেশবিদরা আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশ ১৯৯২ সালের আন্তর্জাতিক পানি কনভেনশনে স্বাক্ষর করলেও ১৯৯৭ সালের কনভেনশনটি সংশোধন বা কার্যকর করেনি। ফলে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে আইনি লড়াইয়ে পিছিয়ে আছে দেশ। বিশেষ করে ‘গঙ্গা ব্যারেজ’ নির্মাণকে জনগণের প্রাণের দাবি হিসেবে পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
প্রধান সুপারিশমালা
সেমিনারের সমাপনীতে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করা হয়:
১। জাতীয় এজেন্ডাঃ বিল, হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণকে জাতীয় উন্নয়ন এজেন্ডার অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে।
২। রাজনৈতিক সদিচ্ছাঃ নতুন নির্বাচিত সরকারকে আইন বাস্তবায়ন ও উচ্ছেদ অভিযানে আপসহীন হতে হবে।
৩। জনগণের অংশগ্রহণঃ স্থানীয় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ‘লোকায়ত জ্ঞান’ কাজে লাগিয়ে জলাভূমি রক্ষা করতে হবে।
৪। শিক্ষাক্রমঃ পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষার গুরুত্ব পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
সেমিনারে রিভারাইন পিপলস-এর শেখ রোকন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক শাকিল আক্তারসহ দেশের বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বক্তারা একমত হন যে, নদী ও জলাভূমি রক্ষা কেবল পরিবেশের বিষয় নয়, এটি নাগরিকের বাক-স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের সাথেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।