একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের দু’টি ঐতিহাসিক আলোকচিত্র। একটিতে বিশ্রামগঞ্জে খড় দিয়ে তৈরি বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল পরিদর্শনে আসা বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের বাংলাদেশ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক কর্নেল এমএজি ওসমানী ( মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী ) অটোগ্রাফ দিচ্ছেন। তাকে ঘিরে রয়েছেন কয়েকজন ডাক্তার, সেবিকারা। ছবিটি প্রদর্শিত হয়েছে রাজধানী আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের গ্যালারি ৩ এর দেয়ালে ।

আরেকটি কর্নেল এম এজি ওসমানীর সাথে ডাক্তার, সেবিকাসহ বিশিষ্টজনেরা। এই ছবিতে বাম দিকে রয়েছেন ডাঃ নাজিমুদ্দিন, ডাঃ এম এ মবিন, ক্যাপ্টেন ডাঃ আখতার আহমেদ, সেক্টর ২ এর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ, এ কে এম শামসুদ্দিন, রেশমা আমিন, সাঈদা কামাল (টুলু), বাংলাদেশ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক কর্নেল এমএজি ওসমানী, মিনু বিল্লাহ, আসমা নিসার, ডালিয়া সালাহউদ্দিন, ক্যাপ্টেন ডাঃ সিতারা বেগম, জাকিয়া সুলতানা, ক্যাপ্টেন নূর, চার ইঞ্জিনিয়ারের একজন। পেছনের সারিতে মোর্শেদ চৌধুরী, শামসুল হক, সুবেদার মান্নান, টি হোসেন, ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সুলতানা কামাল (লুলু), বিগ্রেডিয়ার গুপ্ত, সৈয়দা উবায়দুন্নাহার খুকু আহমেদ, বেলাল।

বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের বাংলাদেশ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক কর্নেল এম.এ.জি. ওসমানী (মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী) কে বিশরামগঞ্জের খড়ের তৈরি বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল পরিদর্শনের সময় স্বাক্ষর করতে দেখা যাচ্ছে। তাকে ঘিরে রয়েছেন বেশ কয়েকজন ডাক্তার এবং নার্স। ছবি: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সৌজন্যে।

এই ছবি প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা ও মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল (লুলু) বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বিশ্রামগঞ্জের লিচু বাগানের প্রায় দেড় একর জমি বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালের জন্য দান করেছিলেন ভারতের নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোসের দেহরক্ষী কুমিল্লার হাবলু ব্যানার্জী।

অক্টোবরে বিশ্রামগঞ্জে বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। ডাঃ এম এ মবিন হাসপাতাল সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেন। পুরোনো ব্যারাকের ডান পাশে ৬০টি বেডের আরেকটি মেডিক্যাল ওয়ার্ড তৈরি হয়। এইসময়ে একদিন বাংলাদেশ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক কর্নেল এমএজি ওসমানী হাসপাতাল দেখতে এলেন। তিনি ডাক্তার, সেবিকাদের কাছে রোগীদের খোঁজখবর নেন। হাসপাতালের কার্যক্রম দেখে খুব খুশি হন। এই সুযোগে সেক্টর ২ এর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ তাঁকে বুঝিয়ে বলেন, হাসপাতালের জন্য আরো কিছু অর্থের প্রয়োজন। কর্নেল ওসমানীও যথাসম্ভব সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

তিনি আরো বলেন, সেদিন আমাদের খুব ভালো লেগেছিল উনার সাথে কথা বলে। একটানা চারমাস ওই জনবিরল জায়গায় থাকতে থাকতে কেউ আমাদের দেখতে এলে খুব ভালো লাগত। অন্য সময় মনে হতো, এই আমাদের জীবন! এ ছাড়া অন্য কোনোভাবে যে সময় কাটিয়েছি কোনোদিন সেটা কখনও মনে পড়তো না।

বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালের সাথে যুক্ত হওয়া প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা সুলতানা কামাল (লুলু) আরো বলেন, স্কোয়াডন লিডার হামিদুল্লাহ ও তাঁর পরিবার এবং শাহাদাত চৌধুরীসহ আমরা দুই বোন ১৬ জুন সোনামুড়ায় বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালে পৌঁছেছিলাম। প্রথমদিকে আমরা দুই বোন ক্যাপ্টেন ডা. আখতার আহমেদ এর সাথে সেবিকা হিসেবে আহতদের সেবা দিই। তখন সেক্টর ২ এর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ আমাদের আশার আলো দেখিয়েছিলেন। আমরা কীভাবে কাজ করব, সে সম্বন্ধে বলেছিলেন। ঐটুকুই আশার বাণী আমাদের যে কি আনন্দ দিয়েছিল তা বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয়। তিনিও আমাদের বলেছিলেন, ‘আরও কিছু মেয়ের আসা দরকার। শুধু দুই জনে তো আর একটি বাহিনী গঠিত হতে পারে না। একথা বলে প্রায় আধ ঘণ্টা পর কমান্ডার রওনা হয়ে হয়েছিলেন বিলোনিয়ার যুদ্ধে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ফিল্ড হাসপাতাল পরিদর্শনের সময় অস্থায়ী সরকারের বাংলাদেশ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক কর্নেল এম.এ.জি. ওসমানী (মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী) ডাক্তার, নার্স এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে। ছবি: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সৌজন্যে।

বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন ডাঃ আখতার আহমেদ এর স্ত্রী সৈয়দা উবায়দুন্নাহার খুকু আহমেদও এখানে সেবিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কর্নেল ওসমানীর বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালে আগমন সম্পর্কে তিনি বলেন, ক্যাপ্টেন ডাঃ আখতার আহমেদ জানতেন, মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি কর্নেল এম এ জি ওসমানী বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল পর্যবেক্ষণে আসছেন। কিন্তু তিনি আমাদের কাউকেই বুঝতে দেননি। বিষয়টি তিনি গোপনই রেখেছিলেন। কর্নেল ওসমানী যখন বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালের কাছাকাছি এলেন অনেকগুলো গাড়ির শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম। সবাই বললেন, ‘কর্নেল ওসমানী আসছেন।’ আমরা একথা শোনামাত্রই সবাই দৌড়ে গেলাম গাড়ির দিকে। তিনি বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালে ১০ থেকে ১৫ মিনিট অবস্থান করেছিলেন। ছবি তোলার সময় রেশমা আমিন আর সৈয়দা সাঈদা কামাল (টুলু) দুই জনে বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালের ব্যানার ধরেছিলেন। তিনি সেক্টর ২ এর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ, ক্যাপ্টেন ডাঃ আখতার আহমেদ, ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ডাঃ নাজিমুদ্দিন, ডাঃ এম এ মবিন, ডা. কিরণশঙ্কর দেবনাথ, সুলতানা কামাল (লুলু) প্রমুখদের সাথে হাসপাতাল নিয়ে আলোচনা করলেন। আমাদের প্রতিনিধি হয়ে সুলতানা কামাল (লুলু) উনার সাথে কথা বলেছিলেন। আমরা মেয়েরা সবাই দূরে দাঁড়িয়ে কর্নেল ওসমানীকে দেখছিলাম। তবে কি আলোচনা হয়েছিল তা শুনতে পাইনি। কর্নেল ওসমানী আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ‘মেয়েরা কাজ করছে, ভালো লাগছে।’ আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় এভাবে তিনি আমাদের অনুপ্রাণিত করেছিলেন । আমাদের সাথে তাকে একটি ছবি তোলার অনুরোধ করেছিলাম। তিনি ছবি তুললেন, এরপর চলে গেলেন।

একাত্তরের পয়লা সেপ্টেম্বরে মিনু বিল্লাহ বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালে যোগ দেন। কর্নেল ওসমানীর বিশ্রামগঞ্জে বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল পর্যবেক্ষণ প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা ও নৃত্যশিল্পী মিনু বিল্লাহ বলেন, আমাদের কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ, ডা. এম এ মবিন, ক্যাপ্টেন ডা. আখতার আহমেদ, ডাঃ নাজিমুদ্দিন, ডা. কিরণশঙ্কর দেবনাথ, ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সাথে তিনি হাসপাতাল ও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করছিলেন। যিনি বাংলাদেশের বিজয়ের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে পাকিস্তানি হানাদারবাহিনীকে শায়েস্তা করার দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন। যুদ্ধ পরিচালনা করছেন, এমন একজন মানুষের কথা এতো কাছ থেকে শুনতে পাবো, দেখতে পাবো, কোনোদিন কল্পনাও করতে পারিনি। উনার কথা দূর থেকে আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। কারণ এই প্রথম বাংলাদেশ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক কর্নেল এমএজি ওসমানীকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। তিনি ফিরে যাবার আগে আমাদের সবার মাঝখানে দাঁড়িয়ে একটি গ্রুপ ছবিও তুলেছিলেন।

মুক্তিযোদ্ধা রেশমা আমিন বলেন, অক্টোবরের মাঝামাঝিতে কর্নেল ওসমানী বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালে আসেন। বাংলাদেশ বাহিনীর সর্বার্ধিনায়ককে আমরা সামনে থেকে দেখতে পাচ্ছি। সবাই আবেগাপ্লুত হয়ে গিয়েছিলাম। কিছুই নেই, উনাকে কি দিয়ে আপ্যায়ন করবো ভাবছিলাম। আমাদের ভারতীয় ক্যালসিভিটা ট্যাবলেট (ভিটামিন সি) খেতে দেওয়া হতো। এই ট্যাবলেট দিয়ে আমরা শরবত বানিয়ে খেতাম। হঠাৎ মাথায় এলো, উনাকেও ক্যালসিভিটা ট্যাবলেট দিয়ে এক মগ শরবত বানিয়ে দিই। যেটা ভাবা সেটাই করলাম। কর্নেল ওসমানীর গোঁফ ছিল সাদা আর চুল কালো । তিনি মগে চুমুক দিতেই শরবতের কমলা রঙে গোঁফ কমলা হয়ে গিয়েছিল। এটা দেখে আমরা মনে মনে হেসেছিলাম। তিনি আরো বলেন, কর্নেল ওসমানী হাসপাতাল ঘুরে দেখার পাশাপাশি মেয়েদের থাকার ব্যবস্থাটাও দেখেন। যাতে পরবর্তীতে এই হাসাপাতালের উন্নয়নের জন্য কিছু অর্থায়ন করতে পারেন।

ক্যাপ্টেন ডাঃ আখতার আহমেদ ও অন্যান্য ডাক্তাররা আসমা নিসার আর সাঈদা কামালকে (টুলু) একটি কাগজে ‘বাংলাদেশ হাসপাতাল’ লিখতে বলেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা সাঈদা কামাল (টুলু) এ প্রসঙ্গে বলেন, আমরা একটি মোটা কাগজকে ব্যানার বানিয়ে কালো কালির কলমে ‘বাংলাদেশ হাসপাতাল’ লিখেছিলাম। কর্নেল ওসমানীর সাথে যখন আমরা ছবি তুলতে দাঁড়াই রেশমা আর আমি ‘বাংলাদেশ হাসপাতাল’ এর ব্যানারটি ধরে রেখেছিলাম। কর্নেল ওসমানীর বাম পাশে, আমি ডান পাশে আর মিনু বিল্লাহ দাঁড়িয়েছিলাম। রেশমা এবং আমার পেছনে- মাঝখানে দাঁড়িয়েছিলেন বড় বোন সুলতানা কামাল (লুলু)। এই ছবিটা আমরা আজীবন হৃদয়ের অন্তঃস্থলে পরম যত্নে লালন করবো।