জামালপুরের ইসলামপুরের মুরাদাবাদ নামে একটি গ্রাম। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এই গ্রামের ৩ কিলোমিটার দূরে থানায় ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প। গ্রামের নিরীহ নারীদের এই ক্যাম্পে ধরে এনে পাকিস্তানি হানাদাররা চালাতো অমানবিক নির্যাতন। অনাকাঙ্খিতভাবেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এই নারী নির্যাতনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়েছিলেন দশ বছরের মোঃ লিয়াকত আলী মিয়া।

সময়টা একাত্তরের জুন মাসের শেষ দিকে। তবে কত তারিখ বা কোন বার সেটা তার মনে ছিল না। ঘটনার দিন গ্রামের মেঠো পথ ধরে পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী ক্যাম্পের সামনে দিয়ে দুধ বিক্রি করতে বাজারে যাচ্ছিলেন তিনি। হাতে দুধের বালতি দেখে পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী ক্যাম্পের প্রহরী তাকে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। দুধ নেওয়ার পর দুই আনা মুদ্রা তার হাতে ধরিয়ে দেয়। খাবার জন্য কিছু মাংস আর রুটিও দেয়। কিন্তু তার দৃষ্টি চলে যায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ক্যাম্পের উত্তর পাশের একটি কক্ষে। সেখানে তিনজন বিবস্ত্র নারীকে পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী পাশবিক নির্যাতন করছিল। ইতিহাসের কলঙ্কময় সেই মূহুর্ত তার ছোট্ট হৃদয়ের গভীরে বেদনার স্মৃতি হিসেবে গেঁথে গিয়েছিল। যা তাকে আজীবন কষ্ট দিয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের গ্যালারি-৪ এর কোণে একটি কাচের শোকেসে একটি রূপালী ‘পাকিস্তানি দুই আনা’ মুদ্রা জ্বলজ্বল করছে। ছবি: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সৌজন্যে।

পাকিস্তানি হানাদারবাহিনীর নারী নির্যাতনের অমানবিক নির্মমতার সাক্ষী হিসেবে পাকিস্তানি দুই আনা মুদ্রাটি তিনি অনেক যত্নে তুলে রেখেছিলেন। যা পরবর্তীতে তিনি আর তাঁর ছেলে এম জিল্লুর রহমান জামিল মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সংগ্রহশালায় হস্তান্তর করেছিলেন। এম জিল্লুর রহমান জামিল তখন জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জের জিলা বাংলা সুগার মিলস্ উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের দশম শ্রেনির মেধাবী ছাত্র।

এ ব্যাপারে লিয়াকত আলী মিয়ার ছেলে জিল্লুর রহমান জামিল বলেন, একদিন বাবার কাছে জানতে চেয়েছিলাম পাকিস্তানি এই দুই আনা মুদ্রার গল্প। মুদ্রার গল্প বলতে গিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে তার দেখা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নারী নির্যাতনের পাশবিক চিত্রের ঘটনাটি তুলে ধরেন।

বাবা জানালেন, ‘গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ লেখাপড়া তেমন জানতেন না। কিন্তু পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে শায়েস্তা করতে তারা জীবন বাজি রেখে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছিলেন। গ্রামের মানুষ মিয়াবাড়ির দহলিজে একত্রিত হয়ে রেডিওতে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের কথা শুনতেন। মিয়া বংশের বড় ছেলে মজনু দেশকে শত্রুমুক্ত করতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। এটাও ছিল তাদের গর্বের বিষয়। অন্যদিকে গ্রামের কয়েকজন সম্পদশালী মওলানা যোগ দিয়েছিল রাজাকার বাহিনীতে। রাজাকাররা গ্রামের মেয়েদের ধরে নিয়ে পাকিস্তানি হানাদার ক্যাম্পে পৌঁছে দিতো। থানায় পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী ক্যাম্প করায় গ্রামের মেয়েরা সম্ভ্রমহানির ভয়ে শিউরে থাকতেন।’

জিল্লুর রহমান জামিলের মতে, পাকিস্তানি হানাদারবাহিনীর নির্মমতা থেকে বাঁচাতে ওই বয়সেই আমার বাবা ফুপুদের আখ ক্ষেতের একটা গর্তে লুকিয়ে রাখতেন। তবে মিয়াবাড়ির মেয়েদের কথা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে পৌঁছুতে বেশি সময় লাগেনি। তাই তারা জুন মাসের শেষদিকে মিয়া বাড়ি ঘেরাও করে। সেদিন মেয়েরা বাড়িতে না থাকলেও ৮ ও ৯ বছরের দুই ছেলে দুলাল এবং আদর বাড়িতেই ছিল। হানাদাররা তাদের মারতে যাবে এই সময় মিয়াবাড়ির বিলের পাশে যে রাজাকার থাকত সে এসে তাদের বোঝায়, এই বাড়ির সবাই পাকিস্তানি। রাজাকারের এই মিথ্যে কথায় সেদিন ছোট্ট শিশু দুটো প্রাণে বেঁচে যায়।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের গ্যালারি ৪ এর কর্ণারের কাচের শোকেজে জ্বলজ্বল করছে করছে রূপালি রঙের এই দুই আনা মুদ্রাটি।

মুদ্রার গল্পটি জাদুঘরের দেয়ালে লেখা। ছবি: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সৌজন্যে

একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদারদের নারী নির্যাতনের সাক্ষী এই পাকিস্তানি দুই আনা। এর পাশের দেয়ালে লেখা- ‘মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আহ্বানে ৭১’ এর প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য সংগ্রহ করেছিল জামালপুরের স্কুল বালক। একাত্তরে তার পিতা ছিলেন একান্তই কিশোর, তখন দুধ নিয়ে বাজারে যাওয়ার সময় আর্মি ক্যাম্পের প্রহরী তাঁকে ডেকে নেয় ভেতরে। পাত্রের দুধ ঢেলে রেখে বিনিময়ে এই পয়সা কিশোরকে দেয়। ক্যাম্পে কিশোর দেখেছিল অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা ‘বিবস্ত্র তিনজন নারী’কে। বাংলার এই তিন কন্যার সারা শরীরে ক্ষতের চিহ্ন। সেই স্মৃতি বালক জীবনে আর ভুলতে পারেনি। সেই পয়সাও আর খরচ করেনি। শিক্ষার্থী পুত্র মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে জমা দিয়েছে পিতার বয়ান এবং এই দুই আনা। পাকিস্তানি এই মুদ্রা নারী-নির্যাতনের একটি ঘটনার সাক্ষী, কীভাবে সেই সাক্ষ্য শুনতে পারা যাবে তা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ।’

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হকের মতে, ‘মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ‘ভ্রাম্যমান জাদুঘর’ এর মাধ্যমে দেশজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য যোগ করার কর্মসূচী সংযুক্ত করেছিল। নেটওয়ার্ক শিক্ষণের মাধ্যমে ছেলেমেয়েদের আমরা উৎসাহিত করি। স্বেচ্ছামূলকভাবে একজন শিক্ষকও এই কর্মসূচীর সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। তারা এই আহ্বান নিজ এলাকার প্রতিটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দেন। তারা শিক্ষার্থীদের বলেন, ‘তোমাদের জন্ম মুক্তিযুদ্ধের অনেক পরে। কিন্তু তোমাদের পরিবার বা চারপাশে অনেক মানুষ আছেন যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন। তাদের অভিজ্ঞতা অনেক মূল্যবান।’ এর মাধ্যমে আমরা অনেক কণ্ঠ খুঁজে পেয়েছি। তিনি আরো বলেন, এভাবে ষাট হাজারের মতো কাহিনী আমাদের সংগ্রহে রয়েছে। এরই একটি ঘটনা নারী নির্যাতনের সাক্ষী পাকিস্তানি দুই আনা। জামালপুরের একজন স্কুল শিক্ষার্থী তার বাবার কাছে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর কথা জানতে চেয়েছিল। মুদ্রা পাওয়ার সেই রক্তক্ষরণ স্মৃতি তার বাবা তাকে জানিয়েছিলেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জামালপুরের মুরাদাবাদ গ্রামের থানায় পাকিস্তানি হানাদারবাহিনীর ক্যাম্পের প্রহরী দুধের বালতিসহ তার বাবাকে নিয়ে গিয়েছিল। পাকিস্তানি হানাদারবাহিনীর দ্বারা নারীদের অত্যাচারের দৃশ্য তিনি ভুলতে পারেননি। তার এই বেদনাতুর অভিজ্ঞতার কথা কেউ কোনোদিন জিজ্ঞেসও করেনি। এই প্রত্যক্ষ ঘটনার সাক্ষী বাবার মুখে পাকিস্তানি দুই আনা পাওয়া ও নারী নির্যাতনের ঘটনাটি আমাদের লিখে পাঠিয়েছিল তার ছেলে। সবচেয়ে বড় কথা মুদ্রাটি তার বাবা খরচ করেননি। সংগ্রহে রেখে দিয়েছিলেন। এটি একটি নিষ্ঠুর কাহিনী। রূপক বা প্রত্যক্ষ অর্থে বলতে গেলে ওই পাকিস্তানি দুই আনা মুদ্রার সাথে তার ব্যথাতুর অনুভূতি জড়িত ছিল। পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী দ্বারা নারী নির্যাতনের কাহিনীর কোনো রেকর্ড নেই। আরো বেশি নৃশংসতা যখন ভিকটিমরাও কিছু বলার অবস্থায় ছিলেন না। অনেকে পরিবারে ফিরে গেলে সেখান থেকেও প্রত্যাখান হয়েছেন। আমরা লেখাটি পেয়ে তাদের সাথে যোগাযোগ করি। বাবা-ছেলে রাজধানীর সেগুন বাগিচার পুরাতন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এসে দুই আনা মুদ্রা হস্তান্তর করেন। আমরা তা সংগ্রহ করে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে প্রদর্শিত করেছি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদারবাহিনীর সেই লোমহর্ষক নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলো দেশের তরুণ প্রজন্মকে জানাতে।’