০২ অক্টোবর ২০২৬, শুক্রবার , বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর উদ্যোগে ‘হাম ও ডেঙ্গুঃ জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নগর পরিকল্পনার ভূমিকা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন জাতীয় প্রেস ক্লাবের ‘জহুর হোসেন চৌধুরী হল’-এ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন বিআইপির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইপির সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম। এছাড়া বক্তব্য দেন বিআইপির সহ-সভাপতি পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান, কোষাধ্যক্ষ পরিকল্পনাবিদ আবু ছালেহ মোঃ শহীদুল্লাহ এবং বোর্ড সদস্য (মেম্বারশিপ অ্যাফেয়ার্স) পরিকল্পনাবিদ সাদী মোঃ হারুন।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভূমি ব্যবহার ও জোনিং, ড্রেনেজ ও পানি ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খোলা জায়গা সংরক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের স্থান নির্বাচন এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পনাবিদদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় সরকার, ওয়াসা, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন মূল প্রবন্ধে বিআইপি’র সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম।
মূল প্রবন্ধে ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের শহরগুলোতে ডেঙ্গু, হাম, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, নগর তাপদাহ এবং অনিরাপদ পানির মতো জনস্বাস্থ্য সংকট ক্রমেই বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে শুধু চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার ওপর নির্ভর করলেই হবে না; নগরের অবকাঠামো, পরিবেশ ও পরিকল্পনাও মানুষের স্বাস্থ্য ও সুস্থতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। রাস্তা, ড্রেনেজ, জলাশয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আবাসনের ঘনত্ব, খোলা জায়গা ও ভূমি ব্যবহারের ধরন জনস্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জরুরি চিকিৎসা ও মশক নিধনের পাশাপাশি উৎসস্থলে ঝুঁকি কমানো প্রয়োজন। নির্মাণাধীন ভবন, বেজমেন্ট, লিফটের গর্তসহ বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। তাই ভবন নির্মাণ ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় পানি জমা প্রতিরোধ এবং নির্মাণস্থলে নিয়মিত লার্ভা পরিদর্শনের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। হামের ক্ষেত্রে তিনি টিকা কভারেজের ঘাটতি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সংক্রমণের ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরেন।
সূচনা বক্তব্যে বিআইপি’র সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, চলতি বছরে দেশে হাম ও ডেঙ্গুর পরিস্থিতি উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এ ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, একজন দায়িত্বশীল পেশাজীবী হিসেবে নগর পরিকল্পনাবিদদেরও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নগর পরিকল্পনা কীভাবে মানুষের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং এ ক্ষেত্রে পরিকল্পনাবিদদের দায়িত্ব জনগণের সামনে তুলে ধরতেই এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।
বিআইপি’র সহ-সভাপতি পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, জনস্বাস্থ্যকে শুধু মানুষের অসুস্থতা হিসেবে দেখলে হবে না; পুরো বাস্তুতন্ত্রের সুস্থতাও নিশ্চিত করতে হবে। তিনি ‘One Health’ ধারণার আলোকে মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরেন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নগরায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা না করার কারণে বর্তমানের বিভিন্ন জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, জনস্বাস্থ্য কোনো মৌসুমি বিষয় নয়; এটি সারা বছর গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তিনি বলেন, নিরাপদ পানির উৎস সংরক্ষণ জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিল্পবর্জ্যের কারণে মেঘনাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর দূষণ বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে নিরাপদ পানির উৎস সংকট তৈরি হতে পারে। তাই নদী ও পানির উৎস রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পরিকল্পনা-সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার জরুরি। আগামী ২০–৩০ বছরের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে বিআইপি সরকারকে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও পেশাগত সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।
বিআইপি’র কোষাধ্যক্ষ পরিকল্পনাবিদ আবু ছালেহ মোঃ শহীদুল্লাহ বলেন, জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় নগর পরিকল্পনাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বিভিন্ন দেশের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, স্থানভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ, টিকাদান কার্যক্রমের স্থান নির্বাচন এবং হাসপাতাল ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয় স্থান নির্ধারণ করা সম্ভব। ভবিষ্যতে কোভিড-১৯-এর মতো কোনো মহামারি দেখা দিলে কোথায় আইসোলেশন বা জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন হবে, তাও আগাম পরিকল্পনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা যেতে পারে।
বিআইপি’র বোর্ড সদস্য (মেম্বারশিপ অ্যাফেয়ার্স) পরিকল্পনাবিদ সাদী মোঃ হারুন বলেন, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জনগণের সচেতনতা ও অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পূর্বপরিকল্পনার মাধ্যমে বিভিন্ন ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জনগণকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীলভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বিআইপি’র সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, পরিকল্পনা ও জনস্বাস্থ্য কোনো একদিনের বিষয় নয়; পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। নগরায়ন, জনঘনত্ব ও দারিদ্র্য বেশি এমন এলাকায় হাম ও ডেঙ্গুর ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় শহরের জনঘনত্ব ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পিতভাবে পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে ইআইএ, টিআইএ ও সিইআইএ-এর পাশাপাশি হেলথ ইমপ্যক্ট এসেসমেন্ট (এইচআইএ) অন্তর্ভুক্ত করা হলে প্রকল্পের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি আগেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন নির্মাণাধীন বা অসম্পূর্ণ স্থাপনা এবং বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি ডেঙ্গুর প্রজননক্ষেত্র তৈরি করছে। আধুনিক জিআইএস, ড্রোন ও ম্যাপিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট এলাকায় কোথায় পানি বা বর্জ্য জমে আছে এবং কোথায় মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল রয়েছে, তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। প্রেস ক্লাব এলাকার মতো নির্দিষ্ট একটি এলাকায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এসব স্থান চিহ্নিত করার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দেশের বিশেষজ্ঞদের রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। জনস্বাস্থ্যকে শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় হিসেবে না দেখে স্থানীয় সরকার ও নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা এবং এ ক্ষেত্রে আরবান প্ল্যানারদের ভূমিকা আরও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওয়াসার পানি সরবরাহ লাইনের পূর্ণাঙ্গ ম্যাপিং, লাইনের বয়স এবং পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন লাইনের মধ্যে সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত সংযোগের তথ্য নিয়মিতভাবে হালনাগাদ রাখা জরুরি। এসব তথ্য জিআইএস-ভিত্তিক সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্ত করা গেলে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে। তিনি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি ও তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনাকে মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আলোচনায় বিআইপি’র সহ-সভাপতি পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, দুই সিটি করপোরেশনে পরিকল্পনাবিদের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় নিয়মিত ম্যাপিং, পরিকল্পনা ও মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনায় জনবল বৃদ্ধি প্রয়োজন। একই সঙ্গে সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য সমন্বয়ের জন্য একটি ইউনিফাইড তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সেটিকে জিআইএস-এর সঙ্গে সমন্বিত করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। এ ক্ষেত্রে বিআইপি ও এর সদস্যরা সরকারকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত বলেও তিনি জানান।
বিআইপি’র সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নগর পরিকল্পনার কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা তুলে ধরেন:
১. ভূমি ব্যবহার ও জোনিং: আবাসিক, শিল্প, খোলা জায়গা ও জলাধারের সুনির্দিষ্ট ভূমি ব্যবহার নিশ্চিত এবং বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল ও জলাশয় সংরক্ষণ করা।
২. হেলথ ইমপ্যক্ট এসেসমেন্ট (এইচআইএ): বড় নগর প্রকল্প ও পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য প্রভাব মূল্যায়ন বা স্বাস্থ্য-সংবেদনশীল স্ক্রিনিং অন্তর্ভুক্ত করা।
৩. নিষ্কাশন ও পানি ব্যবস্থার সমন্বয়: ড্রেনেজ, জলাধার, পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশনকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা।
৪. তথ্যভিত্তিক ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ: ডেঙ্গু, হাম, জলাবদ্ধতা, টিকা কভারেজ, জনঘনত্ব ও তাপঝুঁকির তথ্য GIS-এর মাধ্যমে একত্রিত করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা।
৫. অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনা: নিম্ন আয়ের ও অনানুষ্ঠানিক বসতিতে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা ও টিকাদান সুবিধা সহজলভ্য করার জন্য স্থানভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
৬. পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি: পরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ, অগ্রগতি মূল্যায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
৭. দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য বিবেচনা: ফুটপাত, পার্ক, হাঁটার উপযোগী পরিবেশ এবং সবুজ-নীল অবকাঠামো সম্প্রসারণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
৮. ডেঙ্গু প্রতিরোধে নির্মাণস্থল ব্যবস্থাপনা: নির্মাণাধীন ভবন, বেজমেন্ট, লিফটের গর্ত ও ছাদে পানি জমা প্রতিরোধ এবং নিয়মিত লার্ভা পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা।
৯. হাম প্রতিরোধে স্থানভিত্তিক টিকাদান পরিকল্পনা: জনঘনত্ব, শিশুদের সংখ্যা, টিকা কভারেজ ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের অবস্থান বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ টিকাদান কার্যক্রমের স্থান নির্ধারণ করা।
১০. জিআইএস-ভিত্তিক জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা: জনস্বাস্থ্য ও নগর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন স্থানিক তথ্য সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অগ্রাধিকারভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

