নয়ন খিয়াং, ফ্রান্স,
দুটি দেশ, দুটি সংস্কৃতি এবং বিশ্বকে দেখার দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি বাংলাদেশের দিকে একই সঙ্গে পরিচিতি ও কিছুটা দূরত্বের অনুভূতি নিয়ে তাকাই।
বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া কিংবা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হয়ে ফ্রান্সে বেড়ে ওঠা বা বসবাস করার অর্থ হলো খুব ছোটবেলা থেকেই নিজের জন্মভূমিকে দুটি দৃষ্টিতে দেখতে শেখা। প্রথমটি হলো মমত্ববোধের দৃষ্টি—স্মৃতি, পরিবার, গন্ধ, স্বাদ, প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং এমন এক সংস্কৃতির টান, যা হাজার হাজার কিলোমিটার দূরেও আমাদের সঙ্গে থাকে। দ্বিতীয়টি তুলনামূলকভাবে দূরত্বের দৃষ্টি, যা গড়ে ওঠে ভিন্ন একটি সমাজ, ভিন্ন জীবনযাপন এবং ভিন্ন মূল্যবোধের মধ্য দিয়ে।
বাংলাদেশের প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গি এই দ্বৈত অভিজ্ঞতাই গড়ে তুলেছে।
যে দেশটি প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে
বিদেশ থেকে বাংলাদেশকে প্রায়ই কয়েকটি পরিচিত ছবির মাধ্যমে দেখা হয়—অতিরিক্ত জনঘনত্ব, বন্যা, দারিদ্র্য কিংবা জলবায়ুজনিত নানা সংকট। এসব বাস্তবতা অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু এগুলো বাংলাদেশের পুরো গল্প বলে না।
বাংলাদেশ একই সঙ্গে দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি দেশ। বড় শহরগুলোতে, বিশেষ করে ঢাকায়, এই পরিবর্তন স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। নগরায়ণ, নতুন অবকাঠামো, ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসার, নতুন নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিকাশ এবং বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত একটি নতুন প্রজন্মের উত্থান—সবকিছুই পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।
বহু বছর পর দেশে ফিরে এলে এই পরিবর্তন আরও বেশি চোখে পড়ে। কোনো কোনো এলাকা এতটাই বদলে গেছে যে সেগুলোকে আর আগের মতো চেনা যায় না। নতুন ভবন গড়ে উঠেছে, মানুষের ভোগের ধরন পরিবর্তিত হয়েছে এবং তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা ক্রমেই বিশ্বের অন্যান্য দেশের তরুণদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছে।
তবে এই আধুনিকায়নের পাশাপাশি পুরোনো বাস্তবতাগুলোও বিদ্যমান। পারিবারিক ঐতিহ্য এখনো গুরুত্বপূর্ণ, প্রজন্মগুলোর মধ্যে সম্পর্ক এখনো দৃঢ় এবং দৈনন্দিন জীবনে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক সংহতি এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
গভীরভাবে মানবিক একটি সমাজ
ফ্রান্স থেকে বাংলাদেশের দিকে তাকালে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, তা হলো মানবিক সম্পর্কের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের গুরুত্ব দেওয়া।
পরিবার এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাবারের আয়োজন, ধর্মীয় উৎসব, বিয়ে কিংবা নিছক পারিবারিক পুনর্মিলন—এসবই প্রায়ই বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষকে একত্রিত করে। আতিথেয়তাও বাংলাদেশের সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত একটি মূল্যবোধ।
ফরাসি সমাজের তুলনায়, যেখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের প্রবণতা কিছুটা বেশি, এই ঘনিষ্ঠতা একই সঙ্গে উষ্ণ ও বিস্ময়কর মনে হতে পারে।
তবে এর কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। অন্যের মতামত, সামাজিক রীতিনীতি কিংবা পারিবারিক প্রত্যাশার চাপ কখনো কখনো ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে—বিশেষ করে তরুণ ও নারীদের ক্ষেত্রে। দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি সমাজের এটি বহু বৈপরীত্যের মধ্যে একটি।
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে
সমসাময়িক বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি: শক্তিশালী সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রেখে কীভাবে সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়া যায়?
এই প্রশ্নটি বিশেষ করে তরুণদের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের তরুণরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র দেখছে, বিদেশে পড়াশোনা করছে, ইংরেজিতে কথা বলছে এবং বিশ্বের পরিবর্তনগুলো অনুসরণ করছে। একই সঙ্গে তারা নিজেদের ভাষা, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পরিবারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
বিভিন্ন প্রভাবের এই সহাবস্থান আমাকে আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথাও মনে করিয়ে দেয়।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফরাসি হওয়া মানে প্রায়ই একাধিক জগতের মধ্যে চলাচল করতে শেখা। ফ্রান্সে কেউ আপনাকে ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে দেখতে পারে। আবার বাংলাদেশে কখনো আপনাকে ‘ফরাসি’ হিসেবে দেখা হতে পারে। শেষ পর্যন্ত বোঝা যায়, পরিচয় সব সময় এমন কোনো একটি ঘর নয়, যার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করতে হবে। পরিচয় বহুমাত্রিক হতে পারে।
যে বাংলাদেশকে আরও ভালোভাবে জানা দরকার
ফ্রান্স থেকে দেখলে বাংলাদেশ এখনো তুলনামূলকভাবে অপরিচিত একটি দেশ। অনেকেই দেশটির নাম জানেন, কিন্তু এর সংস্কৃতি, ইতিহাস কিংবা সমাজের বৈচিত্র্য সম্পর্কে বাস্তবে খুব কমই জানেন।
অথচ বাংলাদেশের একটি অসাধারণ সাংস্কৃতিক পরিচয় রয়েছে। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, খাবার, শিল্প ও ঐতিহ্য একটি সমৃদ্ধ ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। বাংলাদেশ এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত, যাদের মধ্যে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অন্যতম। তাঁর সাহিত্যকর্ম পুরো দক্ষিণ এশিয়ার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ।
বাংলাদেশের রয়েছে গ্রামীণ বাংলাদেশ, নগর বাংলাদেশ, শিল্পভিত্তিক বাংলাদেশ, বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ। তাই একটি মাত্র চিত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশকে তুলে ধরা নিঃসন্দেহে ভুল হবে।
বাস্তবতাবোধসম্পন্ন, কিন্তু ভালোবাসায় পূর্ণ একটি দৃষ্টিভঙ্গি
দুটি সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা হয়তো নিজের জন্মভূমিকে আরও কিছুটা দূরত্ব থেকে দেখার সুযোগ দেয়। তখন দেশের শক্তির পাশাপাশি সমস্যাগুলোও দেখা যায়।
বাংলাদেশকে এখনো দ্রুত নগরায়ণ, দূষণ, যানজট, সামাজিক বৈষম্য, সরকারি সেবায় প্রবেশাধিকার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবজনিত ঝুঁকিসহ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
তবে এসব সমস্যা যেন দেশের অর্জন এবং বিশেষ করে এর মানুষের প্রাণশক্তিকে আড়াল না করে।
বাংলাদেশের প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গি তাই প্রথমবার দেশটি আবিষ্কার করতে আসা কোনো পর্যটকের দৃষ্টিভঙ্গি নয়, আবার এমন একজন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও নয়, যিনি সারাজীবন বাংলাদেশে বসবাস করেছেন। এটি দুটি জগতের মধ্যবর্তী একটি দৃষ্টিভঙ্গি।
এটি ফরাসি দৃষ্টিতে দেখা এমন একটি দেশ, যা আমার ইতিহাসের গভীরে প্রোথিত।
হয়তো এই দ্বৈত পরিচয়ই শেষ পর্যন্ত একটি সম্পদ। এটি আমাদের বুঝতে শেখায় যে একটি দেশকে কখনো শুধু তার সমস্যা, পরিসংখ্যান কিংবা গণমাধ্যমে দেখা ছবির মাধ্যমে বিচার করা যায় না। একটি দেশ মূলত মানুষ, পরিবার, স্বপ্ন, বৈপরীত্য এবং আশার সমন্বয়ে গঠিত।
বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি। ফ্রান্স আমার ইতিহাসের একটি অংশ। এই দুইয়ের মাঝখানে আমি শিখেছি, নিজের কোন পরিচয়টি বেছে নিতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। একজন মানুষ একই সঙ্গে একাধিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে।
তবে অনেক কিছুই এখনো উন্নত করা দরকার
নিজের দেশকে ভালোবাসার অর্থ তার সমস্যাগুলো থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া নয়। বরং ভালোবাসা থেকেই অনেক সময় পরিবর্তন ও উন্নতির আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়।
পরিবহন ও যানজট
ঢাকার যানজট সবচেয়ে দৃশ্যমান সমস্যাগুলোর একটি। যানজট নগরবাসীর বিপুল সময় নষ্ট করে এবং এর অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাবও রয়েছে।
গণপরিবহনের উন্নয়ন, যান চলাচলের আরও কার্যকর ব্যবস্থাপনা, পথচারীদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা এবং আরও সমন্বিত নগর পরিকল্পনা দৈনন্দিন জীবনকে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে পারে।
বিষয়টি শুধু আরও রাস্তা নির্মাণের নয়। শহরগুলো কীভাবে পরিকল্পিত হবে এবং মানুষ কীভাবে দক্ষতার সঙ্গে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করবে—সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।
পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
জনসাধারণের ব্যবহারের স্থানগুলোর পরিচ্ছন্নতা আরেকটি ক্ষেত্র, যেখানে উন্নতি খুব সহজেই দৃশ্যমান হতে পারে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং জনসচেতনতা অগ্রাধিকার পেতে হবে। অবশ্যই নাগরিকদেরও ভূমিকা রয়েছে, তবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে উপযুক্ত অবকাঠামো তৈরি এবং তার কার্যকর পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে।
একটি পরিচ্ছন্ন শহর শুধু দেখতে সুন্দর নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দূষণ ও পরিবেশ সুরক্ষা
অর্থনৈতিক উন্নয়নকে পরিবেশ সুরক্ষা থেকে আলাদা করা যায় না।
বড় শহরগুলোর বায়ুদূষণ, নদী ও জলাধারের দূষণ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের কিছু অংশের ক্রমাগত বিলুপ্তি—এসব বিষয় বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।
এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের জন্য বাংলাদেশ বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। তাই উপকূলীয় অঞ্চল সুরক্ষা, পানি ব্যবস্থাপনা, বন্যা প্রতিরোধ এবং অবকাঠামোর জলবায়ু-সহনশীলতা ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
শিক্ষা: তরুণদের জন্য আরও বেশি বিনিয়োগ
বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ একটি বড় শক্তি। এই তরুণ প্রজন্ম দেশের অন্যতম প্রধান সম্পদ।
তবে এই জনমিতিক শক্তিকে উন্নয়নের প্রকৃত সুবিধায় পরিণত করতে হলে শিক্ষায় আরও বিনিয়োগ করতে হবে।
শিক্ষার মানোন্নয়ন, কারিগরি ও পেশাগত প্রশিক্ষণ, বিদেশি ভাষা শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা এবং উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকার তরুণদের জন্য আরও বেশি সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
লক্ষ্য শুধু ডিগ্রিধারী তৈরি করা হওয়া উচিত নয়; তরুণদের সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সক্ষমতা বিকাশের সুযোগও দিতে হবে।
সরকারি সেবায় আরও স্বচ্ছতা ও দক্ষতা
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো সরকারি সেবা।
একজন নাগরিকের জন্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া যতটা সম্ভব সহজ, স্বচ্ছ ও সহজলভ্য হওয়া উচিত। এই পরিবর্তনে ডিজিটাল প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অপ্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া কমানো, সেবার মান উন্নত করা এবং নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আস্থা বাড়ানোই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের অপরিহার্য উপাদান।
নারীদের জন্য আরও বেশি সুযোগ
অর্থনীতি ও সমাজে নারীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবুও এখনো কিছু বাধা রয়েছে।
নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা কার্যক্রম এবং নেতৃত্বের সুযোগ আরও বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।
সমাজের একটি বড় অংশ যদি অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে স্বাধীনভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ না পায়, তাহলে কোনো সমাজই তার পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে না।
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মাঝখানে একটি তরুণ প্রজন্ম
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম সম্ভবত আশাবাদী হওয়ার অন্যতম বড় কারণ।
তরুণরা নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, একাধিক ভাষায় কথা বলছে, বিশ্বের ঘটনাপ্রবাহ অনুসরণ করছে এবং প্রায়ই নিজেদের ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে চায়। একই সঙ্গে তারা নিজেদের সংস্কৃতি, পরিবার ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এই সমন্বয় একটি বড় সম্পদ হতে পারে।
তবে তরুণদের কথা শোনাও জরুরি। তাদের নিজেদের মতামত প্রকাশ, দক্ষতা বিকাশ এবং যে সমাজে তারা আগামী দিনে বসবাস করবে, সেই সমাজ নির্মাণে আরও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে।
বাংলাদেশ বিশ্ব থেকে কী শিখতে পারে—এবং বিশ্ব বাংলাদেশ থেকে কী শিখতে পারে
ফ্রান্সে বসবাসের অভিজ্ঞতা আমাকে কিছু এমন পদ্ধতি ও মূল্যবোধের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছে, যা বাংলাদেশে কিছু ক্ষেত্রে উন্নতির অনুপ্রেরণা হতে পারে—যেমন সরকারি সেবার সংগঠন, গণপরিবহন, পরিবেশ সুরক্ষা, নগর পরিকল্পনা, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং কিছু সরকারি সেবার সহজপ্রাপ্যতা।
তবে বাংলাদেশের অন্য কোনো দেশের অনুলিপি হওয়ার প্রয়োজন নেই।
প্রতিটি সমাজের নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং অগ্রাধিকার রয়েছে। তাই উন্নয়নের ভিত্তি হতে হবে স্থানীয় বাস্তবতা।
একইভাবে ফ্রান্সও বাংলাদেশের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে। আতিথেয়তার সংস্কৃতি, পারিবারিক বন্ধনের গুরুত্ব, আপনজনদের প্রতি পারস্পরিক সহযোগিতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও আশাবাদী থাকার সক্ষমতা—বাংলাদেশি সমাজের এমন কিছু গুণ, যা আমার কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
দুটি দেশের মাঝে একটি বহুমাত্রিক পরিচয়
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফরাসি হওয়ার অর্থ কখনো কখনো দুটি জগতের মাঝখানে থাকার অনুভূতি।
ফ্রান্সে আমার বাংলাদেশি শিকড় আমার পরিচয়ের অংশ। আবার বাংলাদেশে আমার ফরাসি অভিজ্ঞতা স্বাভাবিকভাবেই আমার চিন্তাভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে।
সময়ের সঙ্গে আমি বুঝেছি, এই দুই পরিচয়ের মধ্যে একটি বেছে নেওয়া জরুরি নয়।
বরং তারা একে অপরের পরিপূরক হতে পারে।
ফ্রান্স আমাকে কিছু বিষয়কে আরও দূরত্ব ও সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে দেখতে শিখিয়েছে। বাংলাদেশ আমাকে দিয়েছে একটি সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভাষা, ঐতিহ্য এবং পরিবারের প্রতি গভীর অনুরাগ।
দেশের প্রতি ভালোবাসা থেকেই সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি
বাংলাদেশের প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গি কোনো বাইরের পর্যবেক্ষকের মতো নয়, যিনি দেশটিকে বিচার করতে চান। এটি এমন একজন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, যিনি এই দেশেরই বংশোদ্ভূত এবং দেশটিকে এগিয়ে যেতে দেখতে চান।
আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের অনেক শক্তি রয়েছে—একটি তরুণ জনসংখ্যা, শক্তিশালী সাংস্কৃতিক পরিচয়, অভিযোজনের সক্ষমতা, গতিশীল অর্থনীতি এবং সর্বোপরি এমন একটি জনগোষ্ঠী, যারা নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে কঠোর পরিশ্রম করতে জানে।
তবে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে দেশকে অবকাঠামো, পরিবহন, শিক্ষা ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সুরক্ষা, সরকারি সেবার মান এবং তরুণ ও নারীদের জন্য সুযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আরও উন্নতি করতে হবে।
অগ্রগতি মানে নিজের পরিচয় বিসর্জন দেওয়া নয়। অগ্রগতি হলো একটি দেশের ঐতিহ্য ও শক্তিকে ধরে রেখে যা পরিবর্তন করা প্রয়োজন, তা পরিবর্তন করার সাহস দেখানো।
শেষ পর্যন্ত আমি বাংলাদেশকে এভাবেই দেখি—নিজের শিকড়ের প্রতি গর্ব নিয়ে, ফ্রান্স আমাকে যে দূরত্ব ও দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে তা সঙ্গে নিয়ে এবং আমার জন্মভূমিকে আরও ভালো হয়ে উঠতে দেখার আশায়।
কারণ একটি দেশকে ভালোবাসা মানে শুধু তার গুণের কথা বলা নয়। বরং ভালোবাসার অর্থ হলো কামনা করা যে দেশটি তার নাগরিকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আরও ন্যায়সংগত, পরিচ্ছন্ন, আধুনিক ও মানবিক একটি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারবে।

