বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) রাজধানীর একটি হোটেলে বন্ধু সোশ্যাল ওয়েল ফেয়ার সোসাইটি এই অনুষ্ঠানে ২৬ জন হিজড়া উদ্যোক্তার প্রত্যেককে ৭৫ হাজার টাকা প্রণোদনা দেয়।

হিজড়া সম্প্রদায় থেকে মানুষ দূরত্ব বজায় রাখে। তারাও যে মানুষ, কিছু করতে পারেন। তাদের মেধা, যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে একসাথে কাজ করলে তাদের যোগ্যতা, মেধাকে সমাজের সামনে তুলে ধরতে পারি। এ ধরনের উদ্যোগ নিতে আমাদের সমাজ, রাষ্ট্রকে কখনো নিতে দেখিনি। এই সম্প্রদায়ের সাথে সরাসরি যুক্ত হওয়া, সামনে থেকে দেখা হয়ে ওঠেনি বলে অক্ষেপ প্রকাশ করলেন শওকত আরা আক্তার এমপি।

বন্ধু সোশ্যাল ওয়েল ফেয়ার সোসাইটির আয়োজনে হিজড়া তরুণ ও নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নে প্রণোদনা প্রদান-২০২৬ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শওকত আরা আক্তার এমপি এ মন্তব্য করেন।

শওকত আরা আক্তার এমপি আরো বলেন, তারা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারেন, স্ব স্ব ক্ষেত্রে এতোটা মেধাবী তা সমাজে দেখার সুযোগ হয়নি। এই দেখার সুযোগটি করে দিলো বন্ধু। রাষ্ট্র যেহেতু হিজড়া জনগোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দিয়েছে, এই জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, সবাইকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

সভা প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন সংস্থাটির চেয়ারপার্সন তামান্না রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সালেহ আহমেদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন ইউ এন ওমেন বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি প্রতিনিধি নবনীতা সিনহা, ট্রান্সপ্যারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, ইউএনএফপিএ বাংলাদেশের মাতৃস্বাস্থ্যের কর্মসূচি বিশেষজ্ঞ ডা. অনিমেষ বিশ^াস। এসএমই ফাউন্ডেশনের মহাব্যবস্থাপক মো. আব্দুস সালাম সর্দার উপস্থিত হতে না পারায় তার বার্তা পাঠ করে শোনান সংস্থার আনিসুজ্জামান। বক্তব্য দেন কনসালটেন্ট মোঃ মেছবাহ ইউ আহমেদ, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হটলাইন কর্মকর্তা রাইসুল ইসলাম।

রানী চৌধুরী ও শাওনের নৃত্য পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়।
স্বাগত বক্তব্যে সালেহ আহমেদ বলেন, তিনদশক ধরে হিজড়া সম্প্রদায়ের স্বাস্থ্যসেবা, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক সাবলম্বীতায় কাজ করছি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায়নে তিনটি পদক্ষেপও নিয়েছি। প্রথম যখন উদ্যোক্তা ইন্নয়নে প্রনোদনা শুরু করি, তেমন সাড়া পাইনি। এবারের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এবার সারা দেশ থেকে হিজড়া সম্পদ্রায়ের ৯০ জন মেধাবী উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক আইডিয়ার আবেদন পেয়েছি। চিটাগাং হিল ট্রাকস থেকে শুরু করে সাতক্ষীরা, রাজশাহী বিভিন্ন জেলা থেকে নতুন নতুন ব্যবসায়িক ধারণা পেয়েছি। এই মানুষধের জীবনমান পরিবর্তনে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ২৬টি ব্যবসায়িক ধারণা নিয়েছি।

নবনীতা সিনহা বলেন, একজন মানুষ যখন উদ্যোক্তা হতে যাচ্ছেন, তিনি সাগরের মধ্য থেকে কিছু অর্জন করতে যাচ্ছেন। এটা একটি ক্ষমতার বিষয় বলে আখ্যা করেন তিনি।
তিনি বলেন, বন্ধু যে উদ্যোগ নিয়েছে, উদ্যোক্তাদের যে সফলতা. সমাজে আপনাদের অনÍর্ভুক্তিতে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আমরা কেউ চাই না, সমাজে কেউ পিছিয়ে থাকুক। প্রান্তিক পর্যায় থেকে উচ্চ পর্যায়ে সবাই একসাথে কাজ করতে পারলেই অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবো।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যারা অংশ নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে হিজড়া মুক্তিযোদ্ধাও ছিলেন। অসাধারণ সাহসী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন রনি, তার কথা কেউ জানি না। কারণ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্র তাকে স্বীকৃতি দেয়নি। তার মতো অনেক হিজড়া মুক্তিযোদ্ধা দেশ স্বাধীন করেছেন। কিন্তু স্বীকৃতি পাননি।
তিনি আরো বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে আমাদের হিজড়া বন্ধুরা অংশগ্রহণ করেছেন। মুক্তা, হীরা, নদী, হিয়ার মতো অনেক হিজড়া জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন। আহতদের সেবা করেছেন। অথচ তারাই স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত। এখনো তাদেরকে বৈষম্যের শিকার হতে দেখি।

ডা. অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, হিজড়া সম্প্রদায়ের মেধাভিত্তিক কাজগুলো সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। আমাদের দেশের বিভিন্ন পণ্য বাইরে যাচ্ছে। আমরা যদি আমাদের উন্নত করতে পারি, তাহলে আমাদের পণ্য দেশের বাইরেও রপ্তানি করতে পারবো বলে মনে করেন তিনি।

তামান্না রহমান বলেন, সরকার আমাদের জাতীয় করি কাজী নজরুল ইসলামের নামে এ বছরকে নজরুল বর্ষ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। সংস্কৃতি কর্মীরা একটা নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছি। নজরুল কী শুধু বিদ্রোহী কবি, সাম্যের কবি, তিনি মানবতারও করি। এই মানবতার কবিকে আমরা যদি সত্যি উদযাপন করতে চাই, তাহলে তার মানবতার জায়গাটিকে আমাদের অনেক বেশি তুলে ধরতে হবে।
তিনি আরো বলেন, আমাদের সমাজের বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে এই দিকটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কবি, সাহিত্যিকরা মানুষে মানুষে ভেদাভেদ করতে কখনোই বলেননি। একসাথে দেশ গড়ার কথাই বলে গেছেন। কিন্তু আমাদের সমাজের বাস্তব অবস্থা অনেকটাই আলাদা। এতো বেশি ভেদাভেদ। ধর্মে ধমে, আর্থিক অবস্থার ভেদাভেদ। মানুষকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা না দিয়ে তার অন্য পরিচয়কে সামনে এনে, পোশাক-আশাককে সামনে এনে ভেদাভেদ সৃষ্টি করা। আমরা এর থেকে বেরুতে চাই। হিজড়া সম্প্রদায়কে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দিতে পারি, মাথা উঁচু করে দাঁদাতে পারে এই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি।
বন্ধুর প্রকল্প কোঅর্ডিনেটর জান্নাতে নাঈম তার উপস্থাপনে হিজড়া সম্প্রদায়ের শিক্ষা, ব্যবসায়িক ধরন, ভৌগোলিক অবস্থান, আর্থিক উন্নয়নের দিকগুলো তুলে ধরেন। কিভাবে বন্ধু এই সম্প্রদায়ের ব্যবসায়িক ধারণার সাথে যুক্ত হলো তা কয়েকজন হিজড়ার সাফল্যের গল্প উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।্
এছাড়াও প্রণোদনা প্রাপ্তদের মধ্যে বক্তব্য দেন আবু হাসনা পলি, আনুরি প্রমুখ।