জিএম ফরহাদুল মজুমদার (ঢাকা ব্যুরো),
বিশ্ব অর্থনীতি যখন একের পর এক ধাক্কা, ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে, তখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) তাদের ঋণদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে। ২০২৬ সালের প্রোগ্রাম ডিজাইন অ্যান্ড কন্ডিশনালিটি রিভিউয়ের পর অনুমোদিত এই নতুন রূপরেখায় কম কিন্তু গভীর সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়- এই পরিবর্তন কি শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি আনবে, নাকি কাঠামোগত বৈষম্যের অদৃশ্য দেওয়ালগুলোকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করবে?
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর এক্সিকিউটিভ বোর্ডের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক বা সভাটি সম্প্রতি ওয়াশিংটন, ডিসি’তে অবস্থিত আইএমএফ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত হয়।
আইএমএফ-এর এই ‘প্রোগ্রাম ডিজাইন অ্যান্ড কন্ডিশনালিটি রিভিউ’ বা নতুন পর্যালোচনা কাঠামোর অধীনে যে প্রধান সিদ্ধান্ত ও সংস্কার প্রস্তাবগুলো এসেছে, তা হলো-
১। কম কিন্তু গভীর সংস্কারঃ উন্নয়নশীল ও ঋণগ্রহীতা দেশগুলোর প্রশাসনিক কাঠামোকে শত শত শর্তের চাপে জর্জরিত না করে, বরং দেশের লক্ষ্য অর্জনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং গভীর কিছু নির্দিষ্ট সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া।
২। বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গিঃ নিম্নআয় এবং ভঙ্গুর বা সংঘাতে আক্রান্ত রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব বাস্তবায়ন ক্ষমতা, সামাজিক প্রভাব এবং আলাদা আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নীতিমালা ও সংস্কারের গতিপথ নির্ধারণ করা।
৩। মধ্যমেয়াদী কাঠামোগত সংস্কার কৌশলঃ সাময়িক বা ক্ষণস্থায়ী ত্রাণের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ভারসাম্যহীনতার সংকট মোকাবিলায় কাঠামোগত কৌশল গ্রহণ।
৪। ঝুঁকি মূল্যায়ন ও নমনীয়তাঃ বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও ধাক্কা সামলাতে এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সাথে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে প্রোগ্রামে ঝুঁকি মূল্যায়ন, দৃশ্যপট বিশ্লেষণ এবং কন্টিনজেন্সি প্ল্যানিং বা জরুরি বিকল্প ব্যবস্থার ওপর অধিক জোর দেওয়া।
কাঠামোগত বোঝা হ্রাসের সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক স্বস্তি
আইএমএফের নতুন পর্যালোচনার সবচেয়ে ইতিবাচক দিকটি হলো- সরকারগুলোকে সংস্কারের অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতি বা শর্তের পাহাড় দিয়ে ভারাক্রান্ত না করার স্বীকৃতি। অতীতে দেখা গেছে, শত শত শর্তের চাপে পড়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছিল এবং সংস্কারগুলো কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল।
আইএমএফ যখন স্বীকার করে যে দেশগুলোর নিজস্ব বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং নিম্ন আয়ের বা সংঘাতপীড়িত রাষ্ট্রগুলোর বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া উচিত, তখন তা একধরনের বাস্তবসম্মত মানবিক উপলব্ধির ইঙ্গিত দেয়। একটি মধ্যমেয়াদী কাঠামোগত সংস্কার কৌশল প্রণয়নের মাধ্যমে পেমেন্ট সংকট সমাধানের যে কথা বলা হচ্ছে, তা যদি ওপর থেকে চাপিয়ে না দিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে সাজানো যায়, তবে তা সাময়িক ত্রাণের বদলে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা আনতে পারে।
অদেখা আঘাত: রাজস্ব সমন্বয় ও প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর
তবে চিত্রের অন্য পিঠটিও কম উদ্বেগের নয়। নীতিগতভাবে ‘সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা’র কথা বলা হলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই রাজস্ব সমন্বয়ের ধাক্কা গিয়ে পড়ে সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষের ওপর। অক্সফাম ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর জোরালো সতর্কতা- দ্রুত বা অগ্রিম রাজস্ব সমন্বয় এবং ব্যয় সংকোচন নীতিগুলো জনসেবা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক সুরক্ষাবলয়কে সংকুচিত করে দিতে পারে।
অর্থনৈতিক সংকট কেবল হিসাব-নিকাশের কোনো সংখ্যাগত গ্রাফ নয়; এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে রক্ত-মাংসের মানুষের জীবন ও জীবিকা। যখন বাজেট কাটছাঁটের কারণে একটি সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশটি অরক্ষিত হয়ে পড়ে, তখন তা একধরনের অদৃশ্য অর্থনৈতিক সহিংসতা তৈরি করে। আইএমএফের পক্ষ থেকে সামাজিক ব্যয়ের ওপর নজর রাখার কথা বলা হলেও, কড়া শর্তের বেড়াজালে সেই সুরক্ষা প্রায়শই বাস্তবায়নের সময় হারিয়ে যায়।
সংঘাতের বৃত্ত থেকে বের হয়ে স্থায়ী সমাধানের খোঁজ
আইএমএফের এই পর্যালোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক তাগিদ রয়েছে- তা হলো প্রতিটি ঋণদান ব্যবস্থাকে নিজস্ব যোগ্যতার ভিত্তিতে এবং সাময়িক ত্রাণের পরিবর্তে সংকটের মূল কারণগুলো শেকড় থেকে উৎপাটন করার প্রচেষ্টা।
যদি এই সংস্কার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াটি কেবল আইএমএফের অন্দরমহলের নির্দেশিকা বা টেমপ্লেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সংশ্লিষ্ট দেশের নাগরিক সমাজ, শ্রমিক এবং সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষার সাথে মেলবন্ধন ঘটাতে পারে, তবেই প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব। একটি অনিশ্চিত বিশ্বে টিকে থাকার একমাত্র পথ হলো- ভয় বা জোরজবরদস্তির পরিবর্তে সহযোগিতা, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং এমন একটি মানবিক অর্থনীতি গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি মানুষ ও রাষ্ট্র তার নিজস্ব ভবিষ্যৎ রচনায় পূর্ণ স্বাধীন ও অংশীদার হতে পারে।

জিএম ফরহাদুল মজুমদারঃ নিজস্ব প্রতিবেদক প্রেসেঞ্জা- ঢাকা ব্যুরো।

