মাইনুল হাসান সোহেল (ঢাকা ব্যুরো),
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের (UNGA) অধিবেশনে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। নিউইয়র্ক সময় আজ ২৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার বৈকালিক অধিবেশনে (বাংলাদেশ সময় রাত ৩টা) বিশ্বমঞ্চে স্বগৌরবে দাঁড়াচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সম্পূর্ণ বাংলায় প্রদত্ত তাঁর এই প্রথম জাতিসংঘ ভাষণটি কেবল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির দিগন্তই উন্মোচন করবে না, বরং জাতিসংঘের ইতিহাসে যুক্ত করতে যাচ্ছে এক বিরলতম অধ্যায়।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ইতিহাসে এর আগে কোনো একটি পরিবারের তিন সদস্য- পিতা, মাতা এবং তাঁদের সন্তান, রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান হিসেবে বিশ্বমঞ্চে ভাষণ দেওয়ার এমন নজির নেই। উল্লেখ্য, ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। তাঁদেরই উত্তরসূরি হিসেবে আজ কোটি কোটি বাংলাদেশির আশা-আকাঙ্ক্ষা, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক স্পন্দন নিজের মাতৃভাষায় বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরবেন তারেক রহমান।

উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যস্ততা

জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একের পর এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক, মানবিক উদ্যোগ এবং বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক আলোচনায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।

জাতিসংঘ ও বিশ্বনেতাদের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা

সফরের সূচনাতেই জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টোনীয় গুতেরেস আয়োজিত অভ্যর্থনায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সহধর্মিনী ডা. জুবাইদা রহমান। এরপর তিনি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেজেপ তাইয়িপ এরদোয়ান, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, হাইতির প্রধানমন্ত্রী অ্যালিক্স দিদিয়ের ফিলস-আইমে এবং ওআইসি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেন। এছাড়াও, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বঙ্গ, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক, শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহ এবং মেটা গ্লোবালের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে সুশাসন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার নিয়ে ফলপ্রসূ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম দিনের সন্ধ্যায় তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক সংবর্ধনা সভায়ও উপস্থিত ছিলেন।

স্বাস্থ্য, কৃষি ও জনশক্তিতে ‘গেটস ফাউন্ডেশন’-এর সাথে বড় মাইলফলক

২৩ সেপ্টেম্বর বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সাথে প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠক হয়। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে স্বাবলম্বিতা আনতে দেশে নিজস্ব ভ্যাকসিন উৎপাদন এবং সরকারের ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বিশাল রূপরেখা তুলে ধরা হয়। এই নিয়োগের ৮০ শতাংশই হবেন নারী, যা নারীর ক্ষমতায়নে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ফাউন্ডেশনটি এতে কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতার ব্যাপারে পূর্ণ আশ্বাস দিয়েছে এবং দ্রুতই তাদের একটি বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশ সফর করবে।

রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে সুনির্দিষ্ট ৫ দফা

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘জাস্টিস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং’ শীর্ষক সাইডলাইন বৈঠকে সভাপতিত্বের সুবাদে বিশ্বনেতাদের কাছে ৫ দফা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করেন তারেক রহমান। বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থানরত ১২ লক্ষাধিক আশ্রিত মানুষের আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতি উল্লেখ করে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমারে নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান। বিশ্বনেতারা বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের এই মানবিক ভূমিকার প্রশংসার পাশাপাশি বাংলাদেশের পাশে থাকার সংহতি প্রকাশ করেন।

পরিবেশ সুরক্ষা, নদী রক্ষা ও জলবায়ু তহবিলের দাবি

‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড জাস্ট ট্রানজিশন’ অধিবেশনে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর পক্ষ থেকে ৫ দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশে নদী ও জলবায়ু রক্ষায় গৃহীত ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন, ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, তিস্তা মহাপরিকল্পনা, পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ, এবং সৌর শক্তির মাধ্যমে গ্রিন এনার্জি চালুর মেগা প্রজেক্টগুলো বিশ্ব দরবারে দারুণ সমাদৃত হয়। একই সাথে ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলের ন্যায্য হিস্যা দাবি করেন তিনি।

মার্কিন বিমানের সাথে চুক্তি ও বাণিজ্যিক কূটনীতি

বাণিজ্যিক কূটনীতির অংশ হিসেবে মার্কিন বিমান প্রস্তুতকারী সংস্থা ‘বোয়িং’ ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মধ্যে কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই অনুষ্ঠানে মার্কিন বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লুটনিক, উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডু এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের মতো শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ঢাকা-ওয়াশিংটন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনা নির্দেশ করে।

২৪ সেপ্টেম্বরের অপরাহ্নিক সূচি ও ভাষণ

আজ ২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির অস্তিত্বসংক্রান্ত হুমকির ওপর আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের সেশনে উদ্বোধনী বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফ, থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল ও জাতিসংঘের মহাসচিবের সাথে পৃথক বৈঠকের পর স্থানীয় সময় বিকেল ৫:৩০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় রাত ৩টা) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মূল মঞ্চে বাংলায় ভাষণ দেবেন।

সমাপ্তি সূচিতে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধির নৈশভোজে অংশ নেওয়া এবং ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।

 

মাইনুল হাসান সোহেল: বিশেষ প্রতিবেদক, দৈনিক ইনকিলাব এবং নির্বাহী সম্পাদক (সম্মানসূচক), প্রেসেঞ্জা- ঢাকা ব্যুরো। সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি।