মাহমুদুর রহমান রনি (বরগুনা) বাংলাদেশ :-বঙ্গোপসাগরের মোহনায় বিষখালী ও বলেশ্বর নদীর কোলঘেঁষা উপকূলীয় জেলা বরগুনার  পাথরঘাটা উপজেলা। উপজেলার অধিকাংশ মানুষই মৎস্য পেশার সঙ্গে জড়িত। জীবিকার তাগিদে প্রতিনিয়ত উত্তাল সাগরে পাড়ি জমাতে হয় জেলেদের। তবে মাছ শিকার করতে গিয়ে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ট্রলারডুবি ও বিভিন্ন দুর্ঘটনায় অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন। নিখোঁজ হয়েছেন শত শত জেলে।

৩৩ বছরে ১৯২ জেলের নিখোঁজ ও ১০ বছরে ১০ জেলের  মৃত্যু

উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পাথরঘাটার ১৯২ জন জেলে নিখোঁজ হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিখোঁজ হন ২০০৭ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডরে। ওই বছরই নিখোঁজ হন ৯১ জন জেলে। এছাড়া ১৯৯৩ সালে ৫ জন, ১৯৯৪ সালে ২ জন, ২০০১ সালে ৫ জন, ২০০৬ সালে ১৪ জন, ২০১৪ সালে ৭ জন, ২০১৮ সালে ১৩ জন, ২০২৩ সালে ১৫ জন এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালে ৪ জন জেলে নিখোঁজ হয়েছেন। নিখোঁজ জেলেদের নামসহ উপজেলা পরিষদের মধ্যে একটি ম্যুরাল তৈরি করা হয়েছে।

একটি বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে পাথরঘাটার ১০ জন জেলেকে বিভিন্ন দুর্ঘটনা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।

১৯৯৩ সালের বন্যা থেকে শুরু করে ২০০৭ সালের সিডর, ২০০৮ সালের নার্গিস, ২০০৯ সালের আইলা, ২০১৩ সালের মহাসেন, ২০১৫ সালের কোমেন, ২০১৬ সালের রোয়ানু, ২০১৭ সালের রোমা ও ২০২৩ সালের মিধিলিসহ বিভিন্ন দুর্যোগে পাথরঘাটার বহু জেলে নিখোঁজ হয়েছেন। তাঁদের অনেকেরই আজও কোনো সন্ধান মেলেনি।

৩৫ হাজার জেলের উপজেলায় নিবন্ধিত ১৬ হাজার ৮২০ জন

পাথরঘাটা উপজেলায় জেলে রয়েছেন প্রায় ৩৫ হাজার। এর মধ্যে সরকারি নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৬ হাজার ৮২০ জন। জেলেদের অভিযোগ, মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞার সময়ে এই নিবন্ধিত জেলেরা চাল সহায়তা পেলেও কোনো আর্থিক সহায়তা পান না। ফলে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়তে হয় তাঁদের।

জেলেদের দাবি, অবরোধকালে চালের পাশাপাশি আর্থিক সহায়তার পরিমাণও বাড়াতে হবে। কারণ মাছ ধরতে না পারলেও পরিবারের খাবার, চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা ও অন্যান্য খরচ চালিয়ে যেতে হয়।

জেলে পরিবারে বর্তমান অবস্থা

নিখোঁজের পরও শেষ হয় না দুর্ভোগ জেলে পরিবারের সদস্যরা জানান, স্বজন নিখোঁজ হওয়ার পর মানসিক কষ্টের পাশাপাশি নানা সামাজিক ও আর্থিক সমস্যায় পড়তে হয় তাঁদের। অনেক নিখোঁজ জেলের মৃত্যুসনদ না থাকায় জমিজমা বিক্রি, ওয়ারিশ নির্ধারণসহ বিভিন্ন কাজে জটিলতা তৈরি হয়। নিখোঁজ জেলেদের স্ত্রীদের অনেকে বিধবা ভাতাসহ সরকারি সহায়তাও পাচ্ছেন না।

২০২৩ সালে সাগরে গিয়ে নিখোঁজ হন জেলে ইউসুফ আলী। তাঁর ছোট ভাই ইয়াকুব আলী বলেন, ‘ভাই দুই সন্তান রেখে সাগরে গিয়েছিল। আর ফেরেনি। বাচ্চাগুলো সারা দিন বাবা বাবা করে কান্না করে। এখনো তারা ভাবে, তাদের বাবা হয়তো বাজার নিয়ে বাড়িতে ফিরবে। আমি তাদের কিছুই বলতে পারি না—ভাই বেঁচে আছে, না মরে গেছে।

জেলে জামাল বলেন, জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি জেনেও তাঁদের সাগরে যেতে হয়। বৈরী আবহাওয়া, নিষেধাজ্ঞা ও দুর্ঘটনার কারণে আয় বন্ধ হয়ে গেলেও পরিবারের খরচ থেমে থাকে না। তাই সাগরে জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা, নিরাপত্তা সরঞ্জাম এবং অবরোধকালে পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা

বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি  গোলাম মোস্তফা চৌধুরী  বলেন, সাগরে দুর্ঘটনায় পড়া জেলেদের উদ্ধারে প্রশাসনের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা দাবি করেছেন । দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রমের অভাবে অনেক সময় নিখোঁজ জেলেদের ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সরকারি সহায়তা বৃদ্ধির দাবিও জানান তিনি।

এ বিষয়ে বরগুনা জেলা প্রশাসক তাসলিমা আক্তার বলেন, ‘নিখোঁজ জেলেদের পরিবার যাতে মৃত্যুসনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ক্ষেত্রে ভোগান্তিতে না পড়ে, সে বিষয়েও আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।

A mural within the Upazila Parishad complex featuring the names of the missing. Credits: M. Rahman Roni
Fishermen heading to the deep sea to catch fish. Credits: M. Rahman Roni
Fishermen selling Hilsa fish. Credits: M. Rahman Roni
Fishermen busy at work. Credits: M. Rahman Roni