মাকসুদা লিসা, ঢাকা ব্যুরো, ঘৃণা ও সহিংসতা উসকে দেওয়া বক্তব্যের বিপরীতে সংলাপ, সম্মান ও দায়িত্বশীল যোগাযোগের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান। ১৭ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ‘Global Conference on Promoting Interreligious and Intercultural Dialogue and Tolerance in Countering Hate Speech’ শীর্ষক বৈশ্বিক সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের বিস্তার, এর সামাজিক ক্ষতি এবং তা মোকাবিলায় সংলাপ ও সহনশীলতার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

ড. খলিলুর রহমান বলেন, hate speech বা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য শুধু আপত্তিকর ভাষা নয়। এটি মানুষের মর্যাদা, সমতা এবং জাতিসংঘ সনদের মূল্যবোধের ওপর আঘাত। এ ধরনের বক্তব্য মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে, ব্যক্তিকে অমানবিক হিসেবে উপস্থাপন করে এবং পার্থক্যকে বিপদের কারণ হিসেবে তুলে ধরে। এর মাধ্যমে বৈষম্য, বর্জন ও সহিংসতা বাড়তে পারে এবং সবচেয়ে চরম পরিস্থিতিতে তা নৃশংস অপরাধের পথও তৈরি করতে পারে।

তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুত ও ব্যাপকভাবে সীমান্ত পেরিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। নারী, অভিবাসী, শরণার্থী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, তরুণ ও বিভিন্ন সংখ্যালঘু গোষ্ঠী প্রায়ই এসব বক্তব্যের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্বার্থেও বিদ্বেষমূলক বয়ান ব্যবহার করা হচ্ছে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, এসব প্রযুক্তি মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া, জনমতকে প্রভাবিত করা এবং ঘৃণার বিস্তারকে আরও দ্রুত ও ব্যাপক করতে পারে। তবে প্রযুক্তি দায়িত্বশীলভাবে তৈরি, পরিচালনা ও ব্যবহার করা হলে একই সঙ্গে ঝুঁকি শনাক্ত করা, নির্ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া এবং hate speech মোকাবিলায় সমাজের সক্ষমতা বাড়াতেও কাজে লাগানো সম্ভব।

বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের উৎস নিয়েও কথা বলেন ড. খলিলুর রহমান। তাঁর মতে, hate speech অনেক সময় শুধু শব্দ থেকে শুরু হয় না। ভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের মানুষের প্রতি ভয়, অজ্ঞতা এবং যোগাযোগের অভাব থেকেও এর জন্ম হতে পারে। পরে সেই ভয় ও অনিরাপত্তাকে কাজে লাগিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হতে পারে। এর বিপরীতে মানুষ যখন একে অন্যের কথা শোনে, তখন সন্দেহের জায়গায় বোঝাপড়া এবং শত্রুতার জায়গায় মানবিকতার স্বীকৃতি তৈরি হয়।

এ কারণেই সংলাপ ও সহনশীলতাকে তিনি শুধু আদর্শ নয়, প্রতিরোধ, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও টেকসই উন্নয়নের বাস্তব উপায় হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর মতে, সংলাপ ও সহনশীলতা ঘৃণার মূল কারণ মোকাবিলা করতে পারে, যাতে তা বৈষম্য, সহিংসতা বা সংঘাতে রূপ নেওয়ার আগেই প্রতিরোধ করা যায়। একই সঙ্গে পারস্পরিক আস্থা গড়ে তোলাও বিদ্বেষ, ভুল তথ্য ও শত্রুতার বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করতে পারে।

ড. খলিলুর রহমান তাঁর দায়িত্বে থাকা বর্তমান সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে আস্থা পুনর্গঠনের কথাও উল্লেখ করেন। পারস্পরিক সম্মান এবং সম্মিলিত সমাধানের জন্য ভালো বিশ্বাসে কাজ করার মধ্য দিয়ে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যে সেই আস্থা তৈরি হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিদ্বেষমূলক বক্তব্য মোকাবিলায় শিক্ষা, media and information literacy বা গণমাধ্যম ও তথ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো এবং তরুণদের অর্থবহ নেতৃত্বের সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। স্থানীয় সম্প্রদায় ও ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা শক্তিশালী করা, নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য তথ্য নিশ্চিত করা এবং সরকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, শিক্ষাবিদ, নাগরিক সমাজ, ধর্মভিত্তিক সংগঠন ও সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। তাঁর মতে, এ প্রচেষ্টা পুরো সমাজকে যুক্ত করে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের নীতি—আইনানুগতা, প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা ও বৈষম্যহীনতার ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন।

জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠার মূল বিশ্বাস—প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা ও মূল্য সুরক্ষিত রাখা—স্মরণ করিয়ে দিয়ে ড. খলিলুর রহমান বিভাজনের পরিবর্তে সংলাপ, অবজ্ঞার পরিবর্তে সম্মান এবং ঘৃণার পরিবর্তে সংহতির পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানান। নতুন ও উদীয়মান প্রযুক্তিকে ভয় বাড়ানোর জন্য নয়, বোঝাপড়া বিস্তৃত ও মানবিক মর্যাদা এগিয়ে নেওয়ার কাজে ব্যবহার করার কথাও বলেন তিনি। একই সঙ্গে বাস্তব ও ডিজিটাল—দুই ধরনের পরিসরেই সহনশীলতা, অন্তর্ভুক্তি ও পারস্পরিক সম্মানের মূল্যবোধ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

ড. খলিলুর রহমানের বক্তব্যের মূল বার্তাটি তাই ঘৃণা ও সহিংসতা উসকে দিতে পারে এমন যোগাযোগের বিপরীতে সংলাপ, সম্মান, সহনশীলতা, নির্ভুল তথ্য ও দায়িত্বশীল যোগাযোগকে সামনে আনা। বিভাজনের পরিবর্তে সংলাপ, অবজ্ঞার পরিবর্তে সম্মান এবং ঘৃণার পরিবর্তে সংহতির পথ বেছে নেওয়ার এই আহ্বান শুধু আন্তর্জাতিক পরিসরের জন্য নয়, সমাজের প্রতিদিনের যোগাযোগের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

Nonviolent Journalism-এর দৃষ্টিকোণ থেকে  বক্তব্যটির তাৎপর্য। মতপার্থক্য ও বিরোধ সমাজের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু সেই পার্থক্য প্রকাশের ভাষা যেন ঘৃণা, বিভাজন বা সহিংসতার পরিবেশ তৈরি না করে, সেদিকে দায়িত্বশীল থাকা জরুরি। সংলাপ, পারস্পরিক সম্মান ও দায়িত্বশীল যোগাযোগের মাধ্যমে মতভেদকে বোঝাপড়ার দিকে নেওয়া সম্ভব।