মানবাধিকার রক্ষা, প্রকৃত গণতন্ত্রীকরণ এবং জীবনধারা ও কর্মপদ্ধতি হিসেবে সক্রিয় অহিংসার শক্তিশালী ঘোষণার মধ্য দিয়ে গত রবিবার (২৫ জানুয়ারি) ওয়ার্ল্ড হিউম্যানিস্ট ফোরামের (World Humanist Forum) চতুর্থ অধিবেশন শেষ হয়েছে।

অধিবেশনের প্রথম দিনে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা ছিল স্পষ্ট ও জোরালো। সেখানে বলা হয়, সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে নেতাদের সিদ্ধান্তের মধ্যে ব্যবধান ক্রমশ বাড়ছে। নেতৃত্বের অসঙ্গতি, গণতন্ত্রের ঘাটতি, অসমতা, জলবায়ু সংকট, কর্তৃত্ববাদ এবং ভুল তথ্য বিশ্বব্যাপী অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে মানবতাবাদী কর্মীরা ১৭টি ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের পরিকল্পনা করেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্বজুড়ে সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কণ্ঠস্বরকে জোরালো করা, যারা আমূল বৈশ্বিক পরিবর্তনের দাবি জানায়।

একজন অংশগ্রহণকারী অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন- ‘এই ব্যবস্থা (সিস্টেম) আমাদের মেরে ফেলছে। ‘ এটি কোনো আলঙ্কারিক কথা ছিল না। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য, লাগামহীন অস্ত্র প্রতিযোগিতা, বর্ণবাদ ও বৈষম্য, নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা, অপরাধ ও সংগঠিত অপরাধের বিস্তার, ঘৃণামূলক বক্তব্যের প্রসার এবং পরিবেশগত বিপর্যয় নির্দেশ করে যে- বর্তমান সমাজব্যবস্থা মানুষকে উন্নত জীবন দিতে নিষ্ঠুরভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

তা সত্ত্বেও, সম্মিলিত বিশ্লেষণে জোর দেওয়া হয়েছে যে- বিশ্বজুড়ে নাগরিক সমাজ এবং মানবতাবাদী সংগঠনগুলোর উদ্যোগগুলো গঠনমূলক বিকল্প পথ দেখাচ্ছে এবং আশার আলো জাগিয়ে রাখছে। একটি নতুন বিশ্ব আবির্ভূত হচ্ছে এবং এই ইতিবাচক দিকগুলোকেই সামনে আনতে ও আরো শক্তিশালী করতে হবে।

বর্তমান বিশ্ব সংকটে ওয়ার্ল্ড হিউম্যানিস্ট ফোরামের অবস্থান ও মনোভাব

সম্মেলনে উপস্থিত প্রতিনিধিরা মানবাধিকারকে মানবিক সম্পর্ক গভীর করার ভিত্তি হিসেবে নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এটি কেবল টিকে থাকার নিশ্চয়তা নয়, বরং এমন সব জননীতির বিপ্লবী দিগন্ত- যা সমতা ও কার্যকারিতার সাথে সবার মানসম্মত জীবন নিশ্চিত করবে।

পাশাপাশি, তারা গত শতাব্দীগুলোর বুর্জোয়া শ্রেণির উত্থান থেকে চলে আসা বর্তমান মডেলগুলো পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করেন। এর পরিবর্তে একটি বিকেন্দ্রীকৃত রাজনৈতিক কাঠামোর কথা বলা হয়, যেখানে গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদ বাস্তব রূপ পাবে এবং তা সরাসরি সামাজিক তৃণমূল পর্যায় থেকে আসবে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্বচ্ছ এবং দায়িত্বশীল শাসনব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত।

তারা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো জরুরি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত দায়িত্ব এবং দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান। সংহতি ও বৈশ্বিক সহযোগিতার মাধ্যমে অসমতা, দমন-পীড়ন, সংঘাত এবং বিপর্যয় পেছনে ফেলে আসার ওপর তারা গুরুত্ব দেন।

শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে কোনো কিছুই বাধা হওয়া উচিত নয়। বর্তমানে সামরিক অস্ত্রের মজুদ বৃদ্ধি এবং ক্ষয়িষ্ণু শক্তির আক্রমণাত্মক মনোভাবের সমালোচনা করা হয়। তবে প্রকৃত ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি অর্জনে জনগণকে অবশ্যই অহিংসাকে জীবনধারা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

এই চতুর্থ অধিবেশনের আরেকটি অগ্রাধিকার ছিল- প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোকে ক্ষমতায়িত করা, বিশেষ করে নারী, সংখ্যালঘু এবং এলজিবিটিকিউ( LGBTQ) + সম্প্রদায়কে। একই সাথে দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচার ও রূপান্তরের হাতিয়ার হিসেবে শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

মানবতাবাদ, যা বিভিন্ন সংস্কৃতিতে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন নামে ও রূপে বিদ্যমান, তা মূলত অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সার্বজনীন। এর অর্থ অবশ্যই সব পরিচয়গত বিভাজনকে ছাড়িয়ে মানুষের মর্যাদা বা মানবিক গরিমাকে সবার উপরে স্থান দেবে। এছাড়া জোর দেওয়া হয়েছে যে, মানবতাবাদ কেবল কোনো বিমূর্ত আদর্শ নয়, এটি একটি চর্চা যা শিক্ষা, সংহতি এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করে।

কৌশলগত পদক্ষেপ

বর্তমান সময়ে সংগঠনের রূপ এবং সম্মিলিত কর্মপদ্ধতিকে নবায়ন করা প্রয়োজন। সমন্বিত বৈশ্বিক পদক্ষেপের জন্য একাধিক সংস্থার সাথে সমন্বয় এবং দ্রুত প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া জরুরি। তবে মূল চাবিকাঠি হলো তৃণমূল পর্যায় থেকে কমিউনিটি-ভিত্তিক উদ্যোগ গড়ে তোলা এবং তরুণদের পরিবর্তনের প্রধান কারিগর হিসেবে মূল্যায়ন করা। এমন এক পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন- যা বিশ্বাস, মমতা, অন্তর্ভুক্তি এবং আশা জাগিয়ে তুলবে।

মানবতাবাদীদের জন্য অন্যদের সাথে জোটবদ্ধ হওয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে এর মানে এই নয় যে নিজেদের আদর্শকে বিসর্জন দিতে হবে। বরং বর্তমান সময়ে এমন দূরদর্শী ও উদ্ভাবনী ভাবমূর্তি এবং দৃষ্টান্ত প্রয়োজন- যা মানুষের সিদ্ধান্তহীনতা ও হতাশা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে। ‘আমরা’ বা সমষ্টিগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ (ইউটোপিয়া) গড়ে তোলাই এখনকার পথ।

জনগণ এবং সভ্যতার শক্তি সবসময় তাদের মৌলিক মিথ বা বিশ্বাসের উৎস থেকে উদ্ভূত হয়, যা মানুষের চেতনার গভীরে প্রোথিত। তাই কর্মীদের যদি সেই উৎসের সাথে সংযোগ স্থাপন করে একটি নবায়নকৃত সামাজিক আদর্শ নিয়ে জনমানুষের কাছে পৌঁছানো যায়, তবেই শ্রেষ্ঠ আকাঙ্ক্ষাগুলো বাস্তবায়িত হবে।

সংলাপ থেকে কর্মে

এই চতুর্থ অধিবেশনে প্রস্তাবিত প্রধান পদক্ষেপগুলোর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে তৃণমূল পর্যায়ে অংশগ্রহণ ও কার্যক্রম তৈরি করা, বৈষম্যের শিকার হওয়া জনগোষ্ঠীকে সমর্থন করা এবং স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে সাধারণ পর্যায়ে সব ক্ষেত্রে সমাধানের পথ তৈরি করা।

একইভাবে, কমিউনিটি নেটওয়ার্ক এবং অহিংস জোট গঠন, শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা, ধরিত্রীর যত্ন নেওয়া এবং গণতন্ত্রের নতুন মডেলকে সমর্থন করার বিষয়গুলো অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।

সামরিকীকরণ বর্জন, উপনিবেশবাদ নিরসন এবং ‘অহিংসা সপ্তাহ’ ও ‘শান্তি ও অহিংসার জন্য ৪র্থ বিশ্ব পদযাত্রা’-তে সক্রিয়ভাবে অবদান রাখার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক সংহতি বৃদ্ধি এবং জাতিসংঘের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের কাঠামোর মধ্যে একটি ‘বিশ্ব নাগরিক সমাবেশ’ ডাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সবশেষে, থিম্যাটিক বা বিষয়ভিত্তিক কমিটি গঠনের মাধ্যমে ওয়ার্ল্ড হিউম্যানিস্ট ফোরামের অভ্যন্তরীণ কাঠামো শক্তিশালী করা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর প্রচার বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

চতুর্থ এই অধিবেশন একটি আবেগঘন ঘোষণার মাধ্যমে শেষ হয়, যা নিচে সম্পূর্ণ উদ্ধৃত হলো:

সংকটের সময়ে এক মানবতাবাদী ডাক

আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করি যেখানে সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ক্ষমতাবানরা ক্রমশ উপেক্ষা করছে। অসমতা গভীর হচ্ছে, গণতন্ত্র দুর্বল হচ্ছে, পৃথিবী হুমকির মুখে এবং আমাদের বিভক্ত করতে ভয়ের সংস্কৃতি ব্যবহার করা হচ্ছে। তা সত্ত্বেও, সবখানেই মানুষ সংগঠিত হচ্ছে, একে অপরের যত্ন নিচ্ছে, প্রতিরোধ গড়ছে এবং নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

ওয়ার্ল্ড হিউম্যানিস্ট ফোরাম এমন এক মানবতাবাদের পক্ষে দাঁড়ায়- যা সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে। পরিচয়, সীমান্ত এবং বিশ্বাসের উর্ধ্বে উঠে আমরা প্রতিটি মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করার ঘোষণা দিচ্ছি। মানবতাবাদ কোনো বিমূর্ত দর্শন নয়: এটি আমাদের জীবনযাপন, আমাদের যৌথ সৃষ্টি এবং একে অপরের সাথে আমাদের আচরণের বহিঃপ্রকাশ।

আমরা রূপান্তরের শক্তি এবং জীবনধারা হিসেবে সক্রিয় অহিংসায় বিশ্বাস করি। আমরা স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং টিকে থাকার ভিত্তি হিসেবে মানবাধিকার রক্ষা করি। আমরা এমন এক গণতন্ত্রের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ- যা সবার কথা শোনে। এমন এক শিক্ষার প্রতি- যা মানুষকে ক্ষমতায়িত করে এবং বিজ্ঞান ও যৌক্তিক চিন্তাকে আমাদের সিদ্ধান্তের নির্দেশিকা হিসেবে গ্রহণ করি।

পৃথিবীকে রক্ষা করা কোনো বিকল্প পছন্দ নয়; এটি আমাদের টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য। জলবায়ু রক্ষা, প্রকৃতির যত্ন এবং যারা সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তাদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমরা সামরিকীকরণ এবং কর্তৃত্ববাদকে প্রত্যাখ্যান করি এবং সহযোগিতা, সহানুভূতি ও সাহসকে বেছে নিই।

পরিবর্তন শুরু হয় ঘর থেকে, আমাদের কমিউনিটিতে, সাধারণ জায়গাগুলোতে এবং ছোট ছোট সম্মিলিত কাজের মাধ্যমে- যা পরবর্তীতে আন্দোলনে রূপ নেয়।

তরুণরা কেবল ভবিষ্যৎ নয়- তারা বর্তমান। তৃণমূল থেকে একসাথে কাজ করে আমরা অভাব থেকে মুক্তি এবং বিচ্ছিন্নতা থেকে ‘আমরা’ নামক এক যৌথ সত্তার দিকে এগিয়ে যেতে পারি।

আরেকটি নতুন পৃথিবী কেবল সম্ভবই নয়: এটি ইতিমধ্যেই উঁকি দিচ্ছে।

ওয়ার্ল্ড হিউম্যানিস্ট ফোরাম সেই সমস্ত মানুষকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে- যারা মানবতার শক্তিতে বিশ্বাস করেন, যেন সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে এই নতুন পৃথিবী গড়ে তুলতে পারি।